আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন) সেমিফাইনালে আবার মুখোমুখি হচ্ছে সেনেগাল ও মিসর। আর ম্যাচের আগের আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রাধান্য পাচ্ছেন দুই সাবেক লিভারপুল সতীর্থ সাদিও মানে ও মোহাম্মদ সালাহ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটি তাদের পঞ্চম মুখোমুখি লড়াই হলেও এটিই হয়তো হতে পারে তাদের শেষ মুখোমুখি লড়াই। এখনও সালাহ অপেক্ষায় আছেন অর্থবহ কোনো জয়ের।
২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, ক্যামেরুনের ইয়াউন্ডের ওলেম্বে স্টেডিয়ামে আফকন ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল সেনেগাল ও মিসর। নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য ড্রয়ের পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। প্রথম তিনটি শট সফল হলেও মিসরের মোহাম্মদ আবদেলমোনেমের শট পোস্টে লাগে। এরপর বুনা সার-এর শট ঠেকান মিসরের গোলরক্ষক, কিন্তু সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার মেন্ডি মিসরের চতুর্থ শটটি রুখে দেন। চারটি করে শট শেষে সেনেগাল এগিয়ে যায় ৩–২ ব্যবধানে। তখন ট্রফি জয়ের সুযোগ আসে মানের সামনে।
এই ম্যাচেই পঞ্চম মিনিটে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মানে। ২০১৭ সালে ক্যামেরুনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল টাইব্রেকারেও পেনাল্টি মিস করার স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। মানে পরে বলেছিলেন, আমি বোঝাতে পারব না কতটা কঠিন সময় যাচ্ছিল। রাতে চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুম হতো না। মাথার ভেতর প্রচণ্ড চাপ কাজ করত। ভোর চারটায় ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুমাতে পারতাম না, সবাই জানত আমি এই টুর্নামেন্টটা নিয়ে কতটা আবিষ্ট ছিলাম। এই পেনাল্টির কথা ভাবলে বলতে হয়, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর একটি।
শেষ পর্যন্ত ধ্যানচর্চার কৌশল কাজে লাগিয়ে লম্বা দৌড়ে গিয়ে গোলরক্ষকের ডান পাশে নিচু শটে বল জালে জড়ান মানে। ইতিহাস গড়ে সেনেগাল প্রথমবারের মতো আফকন জেতে। অন্যদিকে মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে সালাহ হতাশায় জার্সির কলার টেনে মুখ ঢেকে ফেলেন। নিজের পেনাল্টি নেওয়ার সুযোগই আর পাননি তিনি।
এর মাত্র সাত সপ্তাহ পর, ২০২২ সালের ২৯ মার্চ ডাকারের স্তাদ আবদুলায়ে ওয়াদে স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফের দ্বিতীয় লেগে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। চতুর্থ মিনিটে আত্মঘাতী গোলে সেনেগাল ১–০ জিতে সমতায় ফেরায় দুই লেগের হিসাব। আবারও টাইব্রেকার। এবার আর অপেক্ষা করেননি সালাহ। প্রথম শট নিতে গিয়ে, লেজার লাইটে চোখ ঝলসানো অবস্থায় তিনি শট মারেন, কিন্তু বল উড়ে যায় বারের ওপর দিয়ে। ফল একই- মানেই শেষ শট নিয়ে সেনেগালকে জেতান।
চার বছর আগের ওই দুই ম্যাচই এবারকার সেমিফাইনালের আগে আলোচনার কেন্দ্রে। যদিও মানে ও সালাহ ২০১৪ সালে আফকন বাছাইপর্বে সেনেগালের মিসরের বিপক্ষে দুই জয়ে একসঙ্গে খেলেছিলেন। মোট পাঁচবার মুখোমুখি হয়ে সালাহ জয় পেয়েছেন মাত্র একবার তাও এমন একটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রথম লেগে, যা শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যায়। এ কারণেই বুধবার তাঞ্জিয়ারে সালাহর সামনে নিজেকে প্রমাণ করার আলাদা তাড়না রয়েছে।
দুজনের বয়সই এখন ৩৩। জন্মের ব্যবধান মাত্র ৬৬ দিন। সেনেগালের ক্যাসামান্স অঞ্চলের এক ইমামের সন্তান মানে পরিবার অমত সত্ত্বেও ১৫ বছর বয়সে ঘর ছেড়ে ডাকারে পাড়ি জমান। অন্যদিকে নীলনদের তীরে জন্ম নেওয়া সালাহ প্রতিদিন তিন-চার ঘণ্টার বাসযাত্রা করে অনুশীলনে যেতেন, পরে তিনিও ১৫ বছর বয়সে কায়রোতে স্থায়ী হন।
ক্যারিয়ারের পথে মিল আছে দুজনেরই। দুজনই নিজ নিজ এলাকায় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করেছেন। তবে লিভারপুলে থাকাকালে তাদের সম্পর্ক ছিল খানিকটা শীতল। সতীর্থ রবার্তো ফিরমিনো একবার বলেছিলেন, ওরা কখনো খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল না। খুব কমই কথা বলত। সম্ভবত আফ্রিকান প্রতিযোগিতায় মিসর-সেনেগাল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই।
এই চাপা টানাপোড়েন প্রকাশ পায় ২০১৯ সালে বার্নলির বিপক্ষে ম্যাচে, যখন মানে অভিযোগ করেন সালাহ তাকে ঠিক সময়ে পাস দিচ্ছিলেন না। তবে দুজনই পরে বলেন, এসব আসলে জয়ের তাগিদ থেকেই। মানে বলেন, আমি তাকে বলেছিলাম শেষ, চিন্তা কোরো না। তোমার প্রতিভা দিয়ে আরও ভালো পাস দেওয়া সম্ভব বলেই আমি রেগেছিলাম। সালাহ বলেন, এগুলো মানবিক। মাঠের বাইরে আমরা খুব কাছের না হলেও একে অপরকে সম্মান করেছি।
একসঙ্গে তারা লিভারপুলকে প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়েছেন। তবু ২০২২ সালের স্মৃতি এবং এটি হয়তো তাদের শেষ মুখোমুখি লড়াই হতে পারে- এই ভাবনাই দ্বন্দ্বে বাড়তি উত্তাপ যোগ করছে।
এই আফকনে সালাহ চার গোল করেছেন, তবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং ঝলক দেখিয়েছেন বেশি। মানে করেছেন মাত্র এক গোল, আগের মতো বিস্ফোরক নন, কিন্তু তার পাসিং বুদ্ধিমত্তা এখনো অটুট।
তারা হয়তো আগের মতো নন, কিন্তু এখনও দুই দানবই দানব। সেনেগাল বনাম মিসর মানেই শুধু মানে বনাম সালাহ নয়- তবু এই দ্বন্দ্ব এড়ানো যায় না। আর তাঞ্জিয়ারে সালাহর সামনে সুযোগ রয়েছে ইয়াউন্ডে ও ডাকারের সেই পেনাল্টির ক্ষত কিছুটা হলেও সারিয়ে তোলার।
সময়ের আলো/এমএইচজে/