ইরানে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী যে মাত্রার সহিংসতা চালিয়েছে, তা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে। ইরানের ভেতর ও বাইরে থাকা একাধিক সূত্র সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে, এই অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে তারা মনে করছে।
দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি জানা খুব কঠিন। তবে সম্প্রতি কিছু ফোন লাইন আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর ভেতর থেকে যে তথ্য আসছে, তাতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হচ্ছে।
সরকারি বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরান সরকার এখনো নিহতের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব দেয়নি। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এক ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেছেন নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার এবং তিনি এই সহিংসতার জন্য ‘বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছেন।
অন্যদিকে, ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার পার্লামেন্টে বলেন, যুক্তরাজ্য সরকারের ধারণা নিহতের সংখ্যা অন্তত ২ হাজার হতে পারে, তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল টেলিভিশনসহ বিরোধী গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ১০ থেকে ১২ হাজারের নিচে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
মর্গের ভিডিওতে ভয়ংকর চিত্র
সিবিএস নিউজ যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের কাছাকাছি একটি মর্গে ৩৬৬ জনের বেশি মরদেহ একের পর এক সারিতে রাখা হয়েছে। অনেক মরদেহে গুলির চিহ্ন, শটগানের আঘাত এবং গুরুতর ক্ষত দেখা যায়। ফরেনসিক কর্মীরা এসব মরদেহের ছবি তুলছেন, আর বাইরে স্বজনেরা তাদের আপনজনকে খুঁজছেন।
একজন ইরানি অ্যাক্টিভিস্ট জানান, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ভিডিওটি বাইরে পাঠাতে একজন ব্যক্তিকে প্রায় ৬০০ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
হাসপাতালগুলোতেও আতঙ্ক
ইরানের ভেতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী তেহরানের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের চাপ দিচ্ছে। আহত বিক্ষোভকারীদের নাম ও ঠিকানা দিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে অনেক আহত মানুষ হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
মানবাধিকার সংগঠনের সতর্কতা
নরওয়েভে অবস্থিত মানবাধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস–এর প্রধান মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, তাদের কাছে যে তথ্য আসছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে দমন-পীড়ন কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সব সীমা অতিক্রম করা হয়েছে।
তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের কথা না বললেও বলেন, বিশ্বশক্তিগুলোর উচিত ইরানিদের সঙ্গে যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা। তার মতে, ইন্টারনেট বন্ধ করে পুরো দেশকে কার্যত এক ধরনের নির্জন কারাগারে পরিণত করা হয়েছে।
এই সংগঠনটি একটি ভিডিও পাওয়ার কথা জানিয়েছে, যেখানে উত্তর ইরানের মাজান্দারান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৭৫ জন নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে সূত্রের নিরাপত্তার কারণে নির্দিষ্ট স্থান জানানো হয়নি।
বিক্ষোভের শুরু ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ডিসেম্বরের শেষ দিকে হঠাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই বিক্ষোভ শুরু হয়। খুব দ্রুত তা ইরানের সব ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, হত্যাকাণ্ড চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নেবে—যদিও কী ধরনের পদক্ষেপ, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
জনগণের ক্ষোভ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
মানবাধিকার কর্মী আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, ইরানের মানুষ শাসকগোষ্ঠীর ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে সরাতে পারে—এমন যে কাউকেই তারা সমর্থন করতে প্রস্তুত।
নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভিও দাবি করেছেন, তিনি ইরানের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপই আরও প্রাণহানি ঠেকানোর একমাত্র উপায়।
এদিকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও ব্যাপকভাবে বন্ধ। ফলে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা জানতে আরও সময় লাগতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত যে তথ্য মিলছে, তাতে স্পষ্ট—ইরান ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়তে পারে।
/ইউএমএইচ