দেশে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ১০টি সুপারিশ করেছে এসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ ইন বাংলাদেশ (এডাব) ও বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত ভূমিকম্পে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় করণীয় শীর্ষক সেমিনারে সুপারিশগুলো তুলে ধরা হয়।
সুপারিশগুলো হলো: ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে, জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নতুন সব ভবনকে ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা অনুযায়ী নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে; রাজউকের অনুমতি ছাড়া ভবন নির্মাণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে; পুরোনো ও দুর্বল ভবনগুলোর নিয়মিত স্ট্রাকচারাল অডিট করে প্রয়োজনে শক্তিশালীকরণ (রেট্রোফিটিং) অথবা অপসারণ করতে হবে; হাসপাতাল, স্কুল, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিশেষভাবে ভূমিকম্প-সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে; প্রতিটি পরিবারের উচিত ভূমিকম্পকালীন করণীয়, নিরাপদ সমবেত স্থান এবং জরুরি যোগাযোগের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করা।
প্রতিটি পরিবারে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী, টর্চলাইট, ব্যাটারি, গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি ও নগদ অর্থসহ একটি জরুরি কিট রাখা; স্কুল, অফিস ও কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সকল বয়সের মানুষের মধ্যে সঠিক করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা; ভূমিকম্প চলাকালীন ভবনের ভেতরে থাকলে টেবিল বা শক্ত আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া, লিফট ব্যবহার না করা এবং কাচ ও ঝুলন্ত বস্তু থেকে দূরে থাকা; ভূমিকম্প-পরবর্তী আফটারশকের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ না করা এবং আহতদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা ও নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা; সম্পদ সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নথি ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ, ভারী আসবাব সঠিকভাবে রাখা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভূমিকম্প বীমা ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো।
সেমিনারে এডাব ও ক্যাপসের পক্ষ থেকে ধারণাপত্র পাঠ করেন ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জিওমেট জার্নাল ও রাজউকের তথ্য অনুযায়ী— যদি ৬.৯ বা তার উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ঢাকা শহরে সংঘটিত হয়, তাহলে ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে এবং দুই লাখের বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। একই সঙ্গে সড়ক, সেতু, পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ২০১৭ সালে ঢাকাকে চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করে সব ধরনের স্থাপনা পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার অংশ হিসাবে ঢাকার ৪৩৩টি হাসপাতাল পরিদর্শন করা হয়। ওই পরিদর্শন প্রতিবেদনে ২৪৮টি হাসপাতালকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৭৪টিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এই তালিকায় ঢাকায় ৫টি বড় হাসপাতাল রয়েছে ভূমিকম্পের বিপজ্জনক ঝুঁকিতে। এই হাসপাতালগুলো হলো— ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিডফোর্ড হাসপাতাল), বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল), জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। এসকল হাসপাতালের বয়স অর্ধশতাধিকেরও বেশি।
ক্যাপসের এই চেয়ারম্যান বলেন, ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে মানুষের আচরণই অনেকাংশে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দেয়। এ সময় আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্প একটি অনিবার্য প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি অনিবার্য নয়। সঠিক পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, দক্ষ প্রশাসন এবং সর্বোপরি সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আলোচকদের মধ্যে কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিল্ভানিয়ার অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ভূমিকম্প আসলে একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এটা প্রতিদিনই পৃথিবীতে ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন পৃথিবীতে ৪০ থেকে ৫০টা ভূমিকম্প হয়। কিন্তু সবগুলোর খবর হয় না। মাত্র যখন মাত্রা ৭-এর ওপরে যায়, তখনই সেটা খবরে আসে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে আমার মনে হয়, সঠিক লোকেরা সঠিক জায়গায় কাজ করছে না। তাই সঠিক লোককে সঠিক দায়িত্ব দিতে হবে। জিওলজিস্টদের অনেক বেশি ক্ষমতায়িত ও সংগঠিত করতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সব ধাপে তাদের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি না করে, তাহলে আপনারা আন্দোলন করবেন, সরকারকে বাধ্য করবেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দুর্বল মাটির ওপর অসংখ্য ভবন তৈরি করা হয়েছে। দুর্বল মাটির ওপর তো ভবন করা-ই যায় না! কিন্তু আমরা দুর্বল মাটির ওপরে বিভিন্ন হাউজিং করে ফেললাম। আমরা কোটি কোটি টাকা দিয়ে সেখানে ফ্ল্যাট কিনি। তাহলে এসব কিছু আসলে আমাদের নিজেদের কর্মের ফসল। আর কেন আমরা এটা করেছি? কারণ আমরা পরিণতির কথা মাথায় নিইনি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমরা যারা প্রফেশনাল প্ল্যানার, আমরা কি এই অনুমোদনগুলো দিচ্ছি? নাকি রাষ্ট্র কোনো গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই অপকর্মগুলো করছে? আর সাধারণ নাগরিকদের তো মাটির গুণাগুণ বোঝার কথা নয়। তারা সেখানে ফ্ল্যাট কিনছে, বাড়ি করছে, হাই-রাইজ বানাচ্ছে। হঠাৎ একদিন যদি ১২ তলা পর্যন্ত ভবনগুলোতে মারাত্মক ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে আমরা সবাই মারা যাব।
অপরাজেয় বাংলার নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু বলেন, আমরা সবাই সেমিনারে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলতে পারি। কিন্তু রুম থেকে বের হয়ে গেলে... আমরা আমাদের মেমোরির মাত্র ২৩ শতাংশ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারি। খুব বেশি হলে বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের বলব—শোনো, আজকে ভূমিকম্প নিয়ে অনেক কিছু জেনেছি। আগে তো কিছুই জানতাম না। অনেক ভালো ভালো লেকচার শুনলাম। এখন আল্লাহ মাফ করুন, কখন ভূমিকম্প হবে কেউ জানে না।
/এমএইচআর