‘দেড় ঘণ্টা ধরে কোলেই ছিল আমার স্ত্রীর নিথর দেহ’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানের রাজধানী তেহরানে এক বিভীষিকাময় রাত ছিল ৮ জানুয়ারি। শহরের কাশানি এলাকায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়—কেউ ক্ষোভ

2026-01-15T11:59:41+00:00
2026-01-15T12:10:13+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
‘দেড় ঘণ্টা ধরে কোলেই ছিল আমার স্ত্রীর নিথর দেহ’
ইরানে নিহত বিক্ষোভকারীর স্বামী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৫৯ এএম  আপডেট: ১৫.০১.২০২৬ ১২:১০ পিএম
৮ জানুয়ারি তেহরানের কাশানি এলাকায় বিক্ষোভকারীরা মিছিল করে। সংগৃহীত ছবি
ইরানের রাজধানী তেহরানে এক বিভীষিকাময় রাত ছিল ৮ জানুয়ারি। শহরের কাশানি এলাকায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়—কেউ ক্ষোভ থেকে, কেউ হতাশা থেকে, কেউ শুধু নিজের ভবিষ্যতের জন্য।

সেই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন রেজা ও তার স্ত্রী মরিয়ম। কিন্তু সেদিন আর বাড়ি ফেরা হয়নি মরিয়মের। সেদিন রাতে বিক্ষোভ শেষে বাড়ি ফেরার সময় তার স্বামী রেজা স্ত্রীকে রক্ষা করতে তার হাত ধরে রেখেছিলেন, যেন ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে না যায়। ঠিক তখনই হঠাৎ তিনি অনুভব করেন, তার হাত হালকা হয়ে গেছে। যেন মুহূর্তেই সবকিছু বদলে যায়।

পরিবারের এক সদস্যকে রেজা পরে বলেন, হঠাৎ আমার হাত হালকা হয়ে গেল। আমি শুধু তার জ্যাকেটটা ধরে আছি—মরিয়ম আর নেই।

গুলিটি কোথা থেকে এসেছে, তা কেউ জানে না। মরিয়ম গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

এরপর শুরু হয় রেজার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তিনি স্ত্রীর নিথর দেহ কোলে করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এক সময় গলির ভেতরেই বসে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণ পর পাশের একটি বাড়ির লোকজন তাকে গ্যারেজে আশ্রয় দেয়, সাদা চাদর এনে মরিয়মের দেহ ঢেকে দেয়। 

নিরাপত্তার কারণে এই দম্পতির প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি।

মরিয়ম মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে তিনি তার ৭ ও ১৪ বছর বয়সী দুই সন্তানের সঙ্গে কথা বলছিলেন। সন্তানদের তিনি বলছিলেন, কখনও কখনও বাবা-মা বিক্ষোভে যান, আর ফিরে আসেন না। আমার বা তোমার রক্ত অন্য কারও রক্তের চেয়ে বেশি দামি নয়। কখনও পার্থক্য করবে না। 

মরিয়মের মতো হাজার হাজার মানুষ সেই বিক্ষোভের দিনগুলোতে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন, কিন্তু আর ফিরতে পারেননি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই পুড়ে যাওয়া বাসটি দেখানো হয়েছে, যা তাদের দাবি অনুযায়ী ১০ জানুয়ারি তেহরানে ধারণ করা। সংগৃহীত ছবি

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই পুড়ে যাওয়া বাসটি দেখানো হয়েছে, যা তাদের দাবি অনুযায়ী ১০ জানুয়ারি তেহরানে ধারণ করা। সংগৃহীত ছবি


কতজন নিহত—তার সঠিক হিসাব নেই

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ইরানি হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (হ্রানা) জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে অন্তত ২ হাজার ৪০০ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২ জন শিশু রয়েছে।

কাশানি, ইরান, ৮ জানুয়ারি। সংগৃহীত ছবি

কাশানি, ইরান, ৮ জানুয়ারি। সংগৃহীত ছবি


তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ বৃহস্পতিবার রাতে ইরান সরকার সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। এতে তথ্য যাচাই করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ইরানে সরাসরি কাজ করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতো বিবিসিও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে রিপোর্ট করতে পারছে না। 

ইরান সরকার এখনো নিহতদের কোনো সরকারি সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, অন্তত ১০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। সরকার বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাকারী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং বলছে, তারা মসজিদ ও ব্যাংকে আগুন দিয়েছে।

কীভাবে শুরু হলো এই বিক্ষোভ

ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার বড় ধরনের পতনের পর ২৯ ডিসেম্বর তেহরানে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা দেশের বহু শহর ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে বিক্ষোভ সরাসরি ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে রূপ নেয়।

নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত কঠোর দমন অভিযান শুরু করে। বিক্ষোভ শুরুর ১১তম দিন, ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার, যখন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনের অবসান দাবি করে।

৮ জানুয়ারি নাজাফাবাদের হোজে এলমিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিক্ষোভ। সংগৃহীত ছবি

৮ জানুয়ারি নাজাফাবাদের হোজে এলমিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিক্ষোভ। সংগৃহীত ছবি


ছোট শহরেও রক্তপাত

বিবিসি এই ফার্সি দেশের ভেতর থেকে অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা পেয়েছে। ঝুঁকি জেনেও তারা তথ্য পাঠিয়েছেন, যেন বিশ্ব জানতে পারে কী ঘটছে।

একজন বলেন, আমাদের এলাকায় রক্তের গন্ধ—অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

আরেকজন জানান, নিরাপত্তা বাহিনী মাথা ও মুখ লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে।

বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ইরানের ৩১টি প্রদেশে। তথ্য বলছে, ছোট শহরগুলোতেও হত্যার মাত্রা বড় শহরের মতোই ভয়াবহ।

উত্তরের ছোট শহর টোনেকাবোনে, যেখানে জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার, সেখানে শুক্রবার নিহত হন ১৮ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সোরেনা গোলগুন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর হামলা থেকে পালানোর সময় সরাসরি তার বুকে গুলি করা হয়। 

তরুণ স্বপ্নগুলো থেমে যাচ্ছে

সোরেনা গোলগুনের পরিবার জানিয়েছেন, ১৮ বছর বয়সী এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে টোনেকাবনে নিরাপত্তা বাহিনী থেকে পালানোর সময় হৃদয়ে গুলি করা হয়েছিল। সংগৃহীত ছবি

সোরেনা গোলগুনের পরিবার জানিয়েছেন, ১৮ বছর বয়সী এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে টোনেকাবনে নিরাপত্তা বাহিনী থেকে পালানোর সময় হৃদয়ে গুলি করা হয়েছিল। সংগৃহীত ছবি


নিহতদের অনেকেই ছিলেন তরুণ, স্বপ্নে ভরা মানুষ। ২৩ বছর বয়সী ফ্যাশন ডিজাইনের শিক্ষার্থী রোবিনা আমিনিয়ান ইতালির মিলানে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতেন। বৃহস্পতিবার তেহরানে তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।

তার মা কেরমানশাহ শহর থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে মেয়ের মরদেহ আনতে যান। ফেরার পথে মেয়ের দেহ কোলে নিয়ে ফিরলেও, নিরাপত্তা বাহিনী তাকে শহরের বাইরে এক নির্জন কবরস্থানে দাফন করতে বাধ্য করে। সেখানে কোনো আত্মীয় বা বন্ধুও উপস্থিত থাকতে পারেননি।

সব নিহতই বিক্ষোভকারী ছিলেন না। কেরমানশাহর ২৪ বছর বয়সী নার্স নাভিদ সালেহি কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে একাধিক গুলিতে নিহত হন।

লাশে ভরে যাচ্ছে ফরেনসিক কেন্দ্র

অনেক মরদেহ তেহরানের কাহরিজাক ফরেনসিক মেডিকেল সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। সেখানে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্ত এলাকায় যান, যাতে পাশের দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভিডিও পাঠাতে পারেন। 

তিনি দাবি করেন, একদিনেই তিনি সেখানে ২ হাজারের বেশি লাশ দেখেছেন।

বিবিসি নিজে সংখ্যা নিশ্চিত করতে না পারলেও, দুটি ভিডিও বিশ্লেষণে অন্তত ৩৬০টির বেশি মরদেহ শনাক্ত করেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

‘এটা যুদ্ধের মতো’

এক তরুণী বিবিসি ফার্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, গত সপ্তাহটা ছিল পুরোপুরি যুদ্ধের মতো।

তিনি জানান, বিক্ষোভকারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু ভয়, দমন আর মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

তার কথায়, যারা এখনো ইরানে আছে, তাদের কী হবে—এই ভয়টাই আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।


/ইউএমএইচ



  বিষয়:   ইরান  বিক্ষোভ  হত্যা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: