১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে ভেনেজুয়েলার আনজোয়াতেগুই রাজ্যের পুয়ের্তো লা ক্রুজে একটি তেল ও গ্যাস প্ল্যান্টে জ্বলন্ত ডিগ্যাসিং চিমনির সামনে দিয়ে সড়ক ধরে নিজের যানবাহন চালিয়ে যাচ্ছেন একজন চালক। সংগৃহীত ছবি
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় তেল ও জ্বালানি সম্পদ রক্ষার জন্য মার্কিন সেনা পাঠানোর বদলে বেসরকারি সামরিক নিরাপত্তা ঠিকাদার ব্যবহার করার কথা ভাবছে। এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এমন সব নিরাপত্তা কোম্পানি লাভবান হবে যাদের এই অঞ্চলে কাজের অভিজ্ঞতা আছে এবং যারা আগে থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন যে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্ররা বলছেন—তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন সেনাদের সেখানে মোতায়েন রাখতে চান না। নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর ভেনেজুয়েলায় যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটি হোয়াইট হাউসের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউসের সাউথ লন থেকে রওনা হওয়ার সময় মেরিন ওয়ানে উঠতে হাঁটছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংগৃহীত ছবি
তেল উৎপাদন পুনরায় চালু করাই মূল লক্ষ্য
ট্রাম্পের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হলো ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন আবার চালু করা। কিন্তু তা করতে হলে প্রথমেই তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামো নিরাপদ রাখতে হবে। মাদুরো চলে যাওয়ার পর যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখানে কার্টেল, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি প্রতিপক্ষরা (রাশিয়া, চীন, ইরান, কিউবা) এসব সম্পদের দখল নিতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই নিরাপত্তার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ কারণে প্রশাসন বড় তেল কোম্পানিগুলোকে বোঝাতে চাইছে যে তারা শুধু কয়েক মাস নয়, দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা দিতে পারবে, যাতে কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে আগ্রহী হয়।
১৩ জানুয়ারি টেক্সাসের বেইটাউন শহরে আকাশ থেকে তোলা দৃশ্যে এক্সন মোবিলের বেইটাউন রিফাইনারি দেখা যাচ্ছে। সংগৃহীত ছবি
বেসরকারি ঠিকাদারদের আগ্রহের কারণ
সূত্রগুলো বলছে, এই আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও ইতিমধ্যে বেশ কিছু বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ভেনেজুয়েলায় কাজ পাওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে। কারণ এই ধরনের চুক্তিতে অর্থের পরিমাণ বিশাল হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৩৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল বেসরকারি নিরাপত্তা, লজিস্টিক ও পুনর্গঠন ঠিকাদারদের পেছনে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ (পেন্টাগন) ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে সহায়তা দিতে পারে—এমন ঠিকাদারদের সক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য চেয়ে একটি নোটিশ জারি করেছে। একই সঙ্গে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন দূতাবাস পুনরায় চালু হলে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ জানিয়ে অনেক ঠিকাদার স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
পেন্টাগন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
১৭ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে ভেনেজুয়েলার জুলিয়া রাজ্যের কাবিমাসে লেক মারাকাইবোতে সংঘটিত একটি তেল ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য। সংগৃহীত ছবি
কারা থাকতে পারে এই নিরাপত্তা কাজে?
এই মুহূর্তে কোন কোম্পানি শেষ পর্যন্ত কাজ পাবে, তা নিশ্চিত নয়। তবে সূত্র জানিয়েছে, কিছু সংস্থা আগে থেকেই ভালো অবস্থানে আছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রে বুল রেসকিউ ফাউন্ডেশন—মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সাবেক সদস্যদের একটি দল। এই সংগঠনটি গত বছর ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে গোপনে দেশ ছাড়তে সহায়তা করেছিল।
গ্রে বুলের প্রতিষ্ঠাতা ব্রায়ান স্টার্ন বলেন, বিষয়টি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়, কিন্তু আলোচনা চলছে। তাঁর ভাষায়, যখন বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তখন তেল কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য সাবেক নেভি সিল, গ্রিন বেরেট ও অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের নিয়ে আসে—ভেনেজুয়েলাতেও এমনটাই হতে পারে।
বেসরকারি সামরিক ঠিকাদার ব্যবহারের বিষয়টি নতুন নয়, কিন্তু এটি সবসময়ই বিতর্ক তৈরি করে। ইরাক যুদ্ধে এসব ঠিকাদারের বিরুদ্ধে বেসামরিক হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধ থেকে মুনাফা লুটের অভিযোগ উঠেছিল।
একটি সূত্র বলেছে, ব্ল্যাকওয়াটারের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা এরিক প্রিন্সও এই কাজে যুক্ত হতে পারেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান ইরাকে তেল অবকাঠামো রক্ষায় বড় ভূমিকা রেখেছিল, তবে ২০০৭ সালে বেসামরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিন্স মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
১৭ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে ভেনেজুয়েলার জুলিয়া রাজ্যের মারাকাইবোতে লেক মারাকাইবোতে অবস্থিত প্যারাগুয়ানা রিফাইনারি কমপ্লেক্সের পেট্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলা এসএ (পিডিভিএসএ)-এর বাজো গ্রান্ডে রিফাইনারি। সংগৃহীত ছবি
তেল কোম্পানিগুলোর অনীহা
মাদুরো গ্রেপ্তার হওয়ার পরও বড় তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এক্সনমোবিলের সিইও ড্যারেন উডস হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা “বিনিয়োগযোগ্য নয়”। এই মন্তব্যে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন এবং বলেন, তিনি এক্সনকে ভেনেজুয়েলা থেকে দূরে রাখতেই আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, যতক্ষণ না নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয় এবং মাদুরো সরকারের অবশিষ্ট প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়, ততক্ষণ বড় তেল কোম্পানিগুলো খুব সতর্ক থাকবে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা খারাপ?
ভেনেজুয়েলা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের লেভেল ৪ ভ্রমণ সতর্কতা তালিকায় রয়েছে—মানে সেখানে ভ্রমণ না করার নির্দেশ। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- অন্যায় গ্রেফতার, নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদ, অপহরণ, অপরাধ, সশস্ত্র মিলিশিয়া এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোলেকটিভোস নামে পরিচিত সশস্ত্র মিলিশিয়া, কলম্বিয়ার গেরিলা সংগঠন এফএআরসি ও ইএলএন, এবং মাদক পাচারকারী গোষ্ঠীগুলো মার্কিন তেল অবকাঠামোর জন্য বড় হুমকি হতে পারে। যদি এদের ওপর চাপ বাড়ানো হয়, তাহলে তারা প্রতিশোধ হিসেবে তেল স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় মার্কিন তেল স্বার্থ রক্ষায় সেনা নয়, বরং বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করতে চায়। উদ্দেশ্য হলো—অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তেল উৎপাদন চালু রাখা, বিদেশি প্রতিপক্ষদের প্রভাব ঠেকানো এবং ভবিষ্যতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে সেখানে ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু বাস্তবে এটি কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর কোম্পানিগুলো কতটা আস্থা রাখতে পারে তার ওপর।