ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ৩ জানুয়ারি মার্কিন সামরিক অভিযানে আটক করার সময় নিহত কিউবান সৈন্যদের অবশেষ রাখা আর্ন (পাত্র) ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে হাভানার সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রণালয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে। সংগৃহীত ছবি
ভেনেজুয়েলায় চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ৩২ জন কিউবান সৈন্য নিহত হন। কিউবা সরকার নিশ্চিত করেছে যে, নিহতরা দেশটির সশস্ত্র বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ছিলেন। এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ভোরে, নিহত সৈন্যদের দেহ হাভানার হোসে মার্তি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়। কফিনগুলো কিউবার জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল এবং সেখানে আনুষ্ঠানিক সামরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিপ্লবী নেতা রাউল কাস্ত্রো উপস্থিত ছিলেন। তারা পূর্ণ সামরিক পোশাকে নিহত সৈন্যদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে কফিনগুলো বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা হয়।
প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল নিহত সৈন্যদের বীরত্বের জন্য শ্রদ্ধা জানান এবং বলেন, তারা ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শহিদ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, কিউবা সব সময় তার মিত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দাঁড়াবে। কিউবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল লাজারো আলবার্তো আলভারেজ বলেন, নিহত সৈন্যরা শেষ গুলি পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা শোকাহত হলেও গর্বিত। কিউবার সম্মান ও মর্যাদা কোনো শক্তিই কিনতে পারবে না।
কিউবানরা হাভানার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রণালয়ে নিহত সৈন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। সংগৃহীত ছবি
হাভানার প্রধান সড়ক ধরে বিশাল সামরিক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিউবা পতাকা নাড়িয়ে, সৈন্যদের স্যালুট জানিয়ে এবং বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে নিহত সৈন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ দিনভর মন্ত্রণালয়ে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
উল্লেখ্য, ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার জন্য সামরিক অভিযান চালায়। অভিযানের সময় নিহত হন কিউবার এই ৩২ জন সৈন্য। মাদুরোকে তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসসহ আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেফতার করা হলেও, মাদুরো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
হাভানায় একটি মোটরকেড কিউবা পতাকায় মোড়ানো সেই সৈন্যদের মরদেহ বহন করছে, যারা কারাকাসে মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছেন। সংগৃহীত ছবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানের নৈতিকতা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানান এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নাকচ করেন। তবে এই ঘটনার পর লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কিউবা, নিকারাগুয়া এবং বলিভিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে অঞ্চলটিতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস থাকায় উদ্বেগ বাড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসন হাভানাকে সতর্ক করেছে যে, ভেনেজুয়েলার তেল ও আর্থিক সহায়তা কিউবায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্র চায় কিউবা বেশি দেরি না করে তাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসুক।
হাভানায় বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রণালয়ের বাইরে ৩২ জন কিউবান সৈন্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দাঁড়িয়ে থাকা কিউবানরা বৃষ্টি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ছাতা ব্যবহার করছেন। এই সৈন্যরা মার্কিন অভিযানে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার সময় নিহত হয়েছেন, এবং এই দৃশ্যটি জানুয়ারি ১৫, ২০২৬ তারিখে নিহত সৈন্যদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধার অনুষ্ঠানের সময় তোলা হয়েছে। সংগৃহীত ছবি
কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল বলেছেন, কিউবা তার সার্বভৌমত্ব এবং মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে রক্তের শেষ বিন্দু পর্যন্ত প্রস্তুত। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন, যদি তা সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হুমকি, নিষেধাজ্ঞা বা অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে কোনো সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে হাভানায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করবে এবং এর প্রভাব পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও পড়বে।