বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রহস্যময় অনেক স্থান। এসব রহস্যময় স্থানের তালিকায় আছে ‘এরিয়া ফিফটি ওয়ান’ নামের এক জায়গা। ‘এরিয়া ফিফটি ওয়ান’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা মরুভূমিতে অবস্থিত। এটি শুধু নাম নয়, একে ঘিরে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে রহস্য, গুজব ও নানা কৌতূহল। এটি এমন একটি এলাকা, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি এই এলাকার আকাশপথেও রয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। সরকারি নীরবতার কারণে এই মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন। এখানে কি শুধু উন্নত যুদ্ধবিমান পরীক্ষা করা হয়, নাকি এখানে লুকিয়ে আছে এলিয়েন ও ভিনগ্রহী প্রযুক্তির কোনো গোপন রহস্য?
‘এরিয়া ফিফটি ওয়ান’ আসলে কী
‘এরিয়া ফিফটি ওয়ান’ নামটির উৎপত্তি আসলে নেভাদা টেস্ট সাইট নামের একটি বিশাল সামরিক পরীক্ষামূলক অঞ্চলের মানচিত্র থেকে। ১৯৫০-এর দশকে এই এলাকাকে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা ও অন্যান্য সামরিক কার্যক্রমের জন্য কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ভাগকে ‘এরিয়া’ নামে একটি নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হত। যেমন এরিয়া-১, এরিয়া-২, এরিয়া-৩ ইত্যাদি। যে অংশে গোপন বিমান পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল, মানচিত্রে সেটি ছিল এরিয়া-৫১। পরবর্তীতে এখানে অত্যন্ত গোপন সামরিক প্রকল্প শুরু হলেও নামটি অপরিবর্তিত থাকে। ধীরে ধীরে এই নামটি কেবল একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়, বরং রহস্য ও গোপনীয়তার প্রতীকে পরিণত হয়।
সামরিক ঘাঁটি থেকে বৈশ্বিক রহস্য
‘এরিয়া ৫১’ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় সামরিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৫ সালে সিআইএ প্রথম এই এলাকাকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইউ-২ গুপ্তচর বিমানের পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর নজরদারি চালানোই ছিল এই ঘাঁটির মূল উদ্দেশ্য।
পরবর্তী কয়েক দশকে ‘এরিয়া ৫১’ এ ‘এ-১২’ ও এক্সকার্ট সুপারসনিক রিকনিস্যান্স বিমান এবং ‘এফ-১১৭ স্টেলথ’ যুদ্ধবিমানসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক সামরিক প্রকল্পের পরীক্ষা চালানো হয়।
১৯৮৯ সালে বব লাজার নামের এক ব্যক্তি গণমাধ্যমে দাবি করেন, তিনি ‘এরিয়া ৫১’ এ ভিনগ্রহী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন। তার এই বক্তব্যকে ঘিরেই এলিয়েন ও ইউএফও সংক্রান্ত নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়ে, যা ‘এরিয়া ৫১’-কে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
২০০৫ সালে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা আবেদনের পর ২০১৩ সালে সিআইএ প্রথমবারের মতো ‘এরিয়া ৫১’ এর অস্তিত্ব স্বীকার করে কিছু গোপন নথি প্রকাশ করে। ২০১৯ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘স্টর্ম এরিয়া ৫১’ ইভেন্ট নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
কেন এটি তৈরি করা হয়েছিল
যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলা যুদ্ধের সময় বিমান পরীক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র হিসেবে ‘এরিয়া ৫১’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে ‘ইউ-২’ এবং ‘এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড’-সহ বিভিন্ন নজরদারি বিমান তৈরি ও পরীক্ষা করা হত। ১৯৫৫ সালে চালু হলেও সিআইএ ২০১৩ সালের আগস্টে ‘এরিয়া ৫১’-এর অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথমবার স্বীকার করে। এতে বলা হয়, ‘এরিয়া ৫১’-এর গোপনীয়তা ছিল মূলত সামরিক প্রযুক্তি সুরক্ষার জন্য, ভিনগ্রহী কিছু আড়াল করার জন্য নয়। সিআইএর সেই স্বীকারোক্তির চার মাস পরই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রকাশ্যে প্রথমবারের মতো ‘এরিয়া ৫১’ নামটি উল্লেখ করেন।
‘এরিয়া ৫১’ কীভাবে আলোচনায় আসে
১৯৪৭ সালে নিউ মেক্সিকোর রোজওয়েল শহরের কাছে একটি অচেনা বস্তু পতনের ঘটনা ঘটে। প্রথমে মার্কিন সেনাবাহিনী একে ‘ফ্লাইং ডিস্ক’ বলে উল্লেখ করলেও পরে দাবি করে, সেটি ছিল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের একটি বেলুন। অনেক ইউএফও গবেষকের মতে, রোজওয়েলে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ গোপনে ‘এরিয়া ৫১’-এ এনে পরীক্ষা করা হয়েছিল। তবে এই দাবির পক্ষে এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই মার্কিন বিমানবাহিনী অনেক সময় এসব ঘটনার ব্যাখ্যা না দেওয়ায় গুজব ও জল্পনা-কল্পনা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
‘এরিয়া ৫১’-এ কী চলছে
বর্তমানে ‘এরিয়া ৫১’ যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর অধীনে পরিচালিত একটি সক্রিয় ঘাঁটি। এখানে কী ধরনের প্রকল্প চলছে, তা প্রকাশ করা হয় না। তবে ধারণা করা হয়, এখানেই আধুনিক স্টেলথ প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান সংক্রান্ত গবেষণা চলছে।
সাবেক কর্মী, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও ইউএফও গবেষকদের মতে, এই এলাকায় ভূগর্ভস্থ বিশাল স্থাপনাও থাকতে পারে, যেখানে গোপন হ্যাঙ্গারের বড় আকারের বিমান বা পরীক্ষাধীন যান লুকিয়ে রাখা হয়।
স্যাটেলাইট ছবিতে গ্রুম লেকের চারপাশে অস্বাভাবিক কিছু উঁচু মাটির ঢিবির মত দেখা গেছে। বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, এখানে ভূগর্ভস্থ স্থাপনা করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় এর ভেতরের অবস্থান নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তারা। তাই ‘এরিয়া ৫১’ আজও পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় স্থান হিসেবে রয়ে গেছে।
সময়ের আলো/কেএইচও