বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে একটি ছবির কারণে শুরু হওয়া আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত দুই শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। তবে শিক্ষকরা দাবি করছেন, তদন্ত ছাড়াই আন্দোলনের চাপে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।
ইসলামবিদ্বেষ ও ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালানোর পর রোববার রাতে দুই শিক্ষককে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মিমু চাকমা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকদিন ধরেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। সব মিলিয়ে হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীরকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এএসএম মহসিনকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। তারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, একজনের সঙ্গে অন্যজনের চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য থাকায়, শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করে তাকে চাকুরিচ্যুত করা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসে নিন্দনীয় নজির।
শুরু কীভাবে হলো
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট জুম্মার নামাজের পর অধ্যাপক ড. শমসাদ আহমেদ কয়েক শিক্ষার্থীসহ আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের শায়খ আহমাদুল্লাহর সঙ্গে দেখা করেন এবং একটি গ্রুপ ছবি তোলা হয়।
সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অধ্যাপককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে।
তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষের অভিযোগ তুলেছেন এবং দাবি করেছেন, মুসলিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি উঠে আসে।
লায়েকা বশীরের পোস্ট
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে লায়েকা বশীরের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, মুখ ঢাকার সংস্কৃতি (নিকাব) সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়াবে।
পোস্টটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি আরও একটি ব্যাখ্যামূলক পোস্ট দেন, যেখানে লেখেন, তার মন্তব্য ব্যক্তিগত এবং নিরাপত্তার বিষয় থেকে এসেছে, কাউকে ছোট করার বা ধর্মীয় বিশ্বাস প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। মোহাম্মদপুরে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মা-মেয়ের হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে আমি আমার ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেছি।
রোববার শিক্ষার্থীরা আবার লায়েকা বশীরের বক্তব্যকে সামনে এনে তার স্থায়ী বহিষ্কার দাবি করে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইসলামবিদ্বেষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবনতি এবং উপাচার্য কামরুল আহসানের দায়িত্বও উল্লেখ করে পদত্যাগের দাবি জানায়। এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রবিবার রাতে লায়েকা বশীরকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে এবং ড. এএসএম মহসিনকেও রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে এবং সমস্ত প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাবলিক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্সের ফেসবুক পেজে বলা হয়, আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লায়েকা বশীরকে ইসলামবিদ্বেষী আচরণ ও হিজাব নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে এবং সায়েম মহসিনকে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন ও একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
লায়েকা বশীর বলেন, আমার ফেসবুক পোস্টের উপর ভিত্তি করে অনলাইন মব তৈরি হয়েছে এবং এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার টার্মিনেশন ঘোষণা করেছে। এটা সম্পূর্ণ অন্যায়।
তিনি আরও বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছিল। তার মাঝেই আমাকে বহিষ্কার করা হলো, যা খুবই দুঃখজনক।
ড. এএসএম মহসিন জানিয়েছেন, তিনি কোনো টার্মিনেশনের চিঠি পাননি। তিনি বলেন, গতকাল সারাদিন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস দখল করে আন্দোলন করেছে। সন্ধ্যার পর অফিস ঘেরাও এবং সাড়ে আটটার দিকে আমাদের টার্মিনেশন ঘোষণা করা হয়।
ড. মহসিন জানান, তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান হওয়ার কারণে এই ঘটনার সঙ্গে তাকে জড়ানো হয়েছে এবং পুরোনো ঘটনায় তাকে ফ্যাসিস্ট বলে ট্যাগ করা হয়েছিল। লায়েকা ম্যাডামের বিষয়টি সামনে আসার পর নতুন আন্দোলনে তাকে পুনরায় জড়ানো হয়েছে।
/ইউএমএইচ