সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যোগ দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডাকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ট্রান্সআটলান্টিক জোটকে (ন্যাটো) সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ফেলেছেন।
ডাভোসে যাওয়ার আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একাধিক পোস্ট ও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ন্যাটো মহাসচিবের সঙ্গে হওয়া ব্যক্তিগত বার্তার অংশ ফাঁস করেন ট্রাম্প।
এএফপি জানায়, এসব পদক্ষেপকে অনেকেই মিত্রদের প্রকাশ্যে অপদস্থ করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
ম্যাক্রোঁকে আক্রমণ
ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে। এক সময়কার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দেন। ম্যাক্রোঁর ‘বোর্ড অব পিসে’ যোগ না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশও করেন তিনি।
ডাভোসের উদ্দেশে ফ্লোরিডা ছাড়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, কেউ তাকে (ম্যাক্রোঁ) চায় না, কারণ সে খুব শিগগিরই ক্ষমতা ছাড়বে। একই সঙ্গে তিনি ফরাসি মদ ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
পরে ট্রুথ সোশ্যালে ম্যাক্রোঁর একটি ব্যক্তিগত বার্তাও পোস্ট করেন। সেখানে মাখোঁ বলেন, আপনি গ্রিনল্যান্ডে কী করছেন তা আমি বুঝতে পারছি না।
ওই বার্তায় রাশিয়াকে সাথে নিয়ে প্যারিসে একটি জি-সেভেন সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দেন সঙ্গে ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নিতে এসে মঙ্গলবার ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
তিনি বলেন, বুলিংয়ের পরিবর্তে সম্মান এবং নৃশংসতার পরিবর্তে আইনের শাসনে বিশ্বাসী আমি।
গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা
ডাভোসের উদ্দেশে রওনা দিয়ে বিমান থেকে একটি পরিবর্তিত ছবি পোস্ট করেন ট্রাম্প। পোস্টে ওভাল অফিসে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের দৃশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডকেও মার্কিন পতাকার নকশায় দেখানো হয়।
এএফপি জানায়, ছবিটি গত আগস্টে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ইউরোপীয় নেতাদের হোয়াইট হাউস সফরের সময় তোলা ছবির বিকৃত সংস্করণ।
২০২৬ সালের শুরুতেই ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা বিশ্ব রাজনীতিতে ঝড় তোলে। পাশাপাশি তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথাও বলেছেন। এ প্রেক্ষাপটে তিনি আরও একটি ছবি পোস্ট করেন।
ওই ছবিতে বরফাচ্ছন্ন প্রান্তরে মার্কিন পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রাম্প, পাশে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
সাইনবোর্ডে লেখা ছিলো— গ্রিনল্যান্ড, মার্কিন ভূখণ্ড, প্রতিষ্ঠা ২০২৬।
প্রতিক্রিয়ায় গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা কম হলেও সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য দ্বীপটিকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
ট্রাম্পের নিশানায় ব্রিটেন
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ নিয়ে গর্ব করা যুক্তরাজ্যও বাদ যায়নি ট্রাম্পের নিশানা থেকে।
মরিশাসকে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের জন্য লন্ডনকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন ট্রাম্প। একে তিনি ‘মহা বোকামি’ আখ্যা দেন।
ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্র–ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
ন্যাটো প্রধানের বার্তা প্রকাশ
ডাভোস সম্মেলনের আগে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের একটি ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প।
ওই বার্তায় সাবেক ডাচ প্রধানমন্ত্রী রুট লেখেন, গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ন্যাটো প্রধান আরও লেখেন, আপনাকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
ট্রাম্পের এই পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব আন্দেরস ফগ রাসমুসেন এএফপিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে তোষামোদ করার দিন শেষ।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ডাভোস সম্মেলনে যোগ দেয়ার আগে এক রাতের মধ্যেই এসব মন্তব্য ও পোস্ট করেন ট্রাম্প, যা ইতোমধ্যে বৈশ্বিক রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
এ অবস্থায় গত ৮০ বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি—ন্যাটো জোট রক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বিগ্ন ইউরোপীয় দেশগুলো।
সময়ের আলো/এসকে/