গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য আরও জোরালো হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘এখান থেকে আর ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই, গ্রিনল্যান্ড আমাদের জন্য অপরিহার্য’।
হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য তিনি কতদূর যেতে প্রস্তুত। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা সময় হলে জানতে পারবেন’।
এদিকে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব এখন ‘নিয়মহীনতার দিকে এগোচ্ছে’।
বুধবার ট্রাম্পের দাভোসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, সেখানে ‘গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে’।
এদিকে এক দীর্ঘ প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ‘সবকিছু বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে’।
ন্যাটো ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘ন্যাটোর জন্য আমার চেয়ে বেশি কেউ কিছু করেনি’। তিনি আরও মন্তব্য করেন, ‘ন্যাটো খুশি থাকবে, আমরাও খুশি থাকব। বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য আমাদের ন্যাটো দরকার’।
তবে তিনি একই সঙ্গে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে ন্যাটো আদৌ পাশে দাঁড়াবে কি না। তার ভাষায়, ‘আমি জানি আমরা তাদের বাঁচাতে যাব, কিন্তু তারা আমাদের জন্য আসবে কি না, সেটা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে’।
বর্তমানে ন্যাটো জোটে ৩২টি দেশ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই জোটের ১২টি প্রতিষ্ঠাতা দেশের একটি। ন্যাটোর মূল নীতি হলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা, যা অনুচ্ছেদ ৫–এ বলা আছে—একটি সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা।
গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প। এনবিসি নিউজ এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি শুধু বলেন, ‘কোনো মন্তব্য নেই’।
মঙ্গলবার বিবিসি নিউজনাইটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডের শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী নাজা নাথানিলসেন বলেন, ট্রাম্পের দাবিতে গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ‘বিস্মিত’।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমেরিকান হতে চাই না, এটা আমরা খুব পরিষ্কারভাবে বলেছি’। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আমাদের সংস্কৃতি ও অধিকারকে আপনি কতটা গুরুত্ব দেন?’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ট্রাম্পই সবচেয়ে বেশি বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছেন বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপও ধীরে ধীরে ট্রাম্পের প্রতি নরম অবস্থান থেকে সরে আসছে।
দাভোস ফোরামের আগে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে কিছু স্ক্রিনশট শেয়ার করেন, যেগুলোতে তিনি দাবি করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ও ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের পাঠানো বার্তা রয়েছে।
ওই বার্তায় রুট বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যদিকে ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘আপনি কী করছেন, আমি বুঝতে পারছি না’, তবে তিনি প্যারিসে অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দেন।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লিয়েন ফোরামের প্রথম দিনে বক্তব্য দিয়ে বলেন, আর্কটিক নিরাপত্তায় ইউরোপ ‘পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। তবে তিনি জোর দেন, এটি একসঙ্গে কাজ করলেই সম্ভব।
তিনি ট্রাম্পের প্রস্তাবিত নতুন শুল্ককে ‘ভুল’ বলে আখ্যা দেন।
ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতা করলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আটটি ইউরোপীয় দেশ থেকে আমদানি করা সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
ভন ডার লিয়েন বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক কিংডমের সঙ্গে ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করছে এবং তাদের সার্বভৌমত্ব ‘অবিচ্ছেদ্য’।
কানাডার নেতা মার্ক কার্নিও একই সুরে বলেন, ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫–এর প্রতি কানাডার অঙ্গীকার ‘অটল’। তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে আছি এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে পুরোপুরি সমর্থন করি’।
ম্যাক্রোঁ বলেন, তিনি ‘উৎপীড়কদের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং আইনের শাসনকেই বেশি গুরুত্ব দেন’।
এর আগে ট্রাম্প ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন, যখন ম্যাক্রোঁ গাজার ‘বোর্ড অব পিসে’ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন।
ম্যাক্রোঁ ‘অন্তহীন শুল্ক যুদ্ধের’ নিন্দা জানান, বিশেষ করে যখন শুল্ককে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান, যার মধ্যে রয়েছে তথাকথিত ‘বাণিজ্য বাজুকা’।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিটির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জুলাইয়ে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদন স্থগিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে।
/ইউএমএইচ