আগামীকাল দেশীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের জন্মবার্ষিকী। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার বাড়িতে জন্ম হয়েছিল এই কিংবদন্তির। বেঁচে থাকলে আগামীকাল ৮৪ বছর পূর্ণ করে ৮৫’তে পা দিতেন তিনি। বরেণ্য এই অভিনেতা দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন। অভিনয় ছাড়াও পরিচালনা করেছেন ১৬টি চলচ্চিত্র।
গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন। ২০১৫ সালে অর্জন করেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। তিনি পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন রাজ্জাক। কিংবদন্তি এই অভিনেতার জন্মদিনে স্মৃতিচারণ করেছেন তার ছেলে।
আব্বাকে নিয়ে লিখতে বসে ভাবছি অনেক। চোখের সামনে ভেসে উঠছে কত স্মৃতি। আর বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছে- ছোটবেলায় বা বড় হয়েও যেকোনো সমস্যা, আনন্দ বা চাওয়া নিয়ে আব্বার কাছে ছুটে যেতাম প্রথমেই। সত্যি কথা বলতে আব্বার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। উনাকে সবকিছু শেয়ার করতাম। আব্বা সব কথা শুনতেন। আব্বা চলে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত মনে হতো উনি আমার, আমাদের সঙ্গেই থাকবেন এভাবে আজীবন। কখনো ভাবিনি আব্বাকে হারিয়ে তাকে নিয়ে আমার স্মৃতিচারণ করতে হবে।
আব্বা অসম্ভব পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। একটা ঘটনার কথা বলি। এটা হয়তো অনেকেই জানেন। কলকাতা ছেড়ে আব্বা যখন প্রথম ঢাকায় আসেন, সঙ্গে ছিলেন মা আর ভাইয়া। ভাইয়া তখন খুবই ছোট। বয়স হয়তো ৬-৭ মাস হবে। ভারতের সীমানা পেরিয়ে আব্বা সরাসরি এসে নামেন কমলাপুর রেলস্টেশনে। সেখানে এক জায়গায় মা আর ভাইয়াকে কিছু সময়ের জন্য রেখে আব্বা একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে হেলান দিয়ে বসে বিশ্রাম নেন। বসে বসে নিজের জীবন, কাজ ও সংসার নিয়ে ভাবছিলেন।
এই যে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে থাকার যে ভঙ্গিটি সেটিই পরবর্তী সময়ে আব্বা যখন প্রতিষ্ঠিত হন তখন তা হয়ে উঠে তার প্রযোজনা সংস্থা রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের লোগো। ‘ল্যাম্পপোস্টের নিচে একজন মানুষ বসা। পেছনে ডাস্টবিন। লোকটি তার জীবন নিয়ে গভীরভাবে ভাবছে’- এটি ছিল লোগোর মূল ভাবনা। আব্বার পরিকল্পনামতো এটার নকশা করেছিলেন সুভাষ দত্ত। আমাদের সবকটি প্রতিষ্ঠানে, সাইনবোর্ডে, প্যাডে এই লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। আব্বা কখনো তার অতীত ভুলে যাননি। নিজের অতীতকে সঙ্গে করেই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নিজেকে।
আব্বার একটা বিষয় ছিল- কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ করলে কাজের মধ্যে তা প্রমাণ করতেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে যে পরিচালক আব্বাকে মোটেও পাত্তা দেননি বরং আয়নায় চেহারা দেখে আসতে বলেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তারই একাধিক সিনেমায় কাজ করেছিলেন আব্বা। কথার জবাব তিনি কাজ দিয়ে দিয়েছিলেন। এখানে একটি ঘটনা বলি- একবার এফডিসিতে যাওয়ার পথে কারওয়ান বাজার রেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় একজন কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘সিনেমার এত বড় নায়ক রিকশায় যাতায়াত করেন।’
কথাটা শুনে আব্বার খুবই খারাপ লেগেছিল। এই ঘটনার পরদিনই আব্বা তার প্রথম গাড়িটি কেনেন। গাড়িটির ব্র্যান্ড ছিল ডাটসান ব্লুবার্ড। এর মাধ্যমে আব্বার গাড়ির যাত্রা শুরু। সেই গাড়ি দিয়েই তিনি ড্রাইভিং শেখেন। এরপর তিনি একের পর এক অনেক গাড়ি কেনেন। গাড়ি কেনা তার শখে পরিণত হয়েছিল। সেই সময়ের বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি আব্বার সংগ্রহে ছিল। রাস্তায় চলে আবার পানিতে চলে এমন গাড়িও কিনেছিলেন। উনার কোনো কোনো গাড়ি বিভিন্ন সিনেমার কাজেও কিন্তু ব্যবহার হয়েছে।
শুটিংয়ের কাজে তুমুল ব্যস্ত থাকার কারণে আব্বা শরীরচর্চা করার সময় পেতেন না। ভোরে বাসা থেকে বেরিয়ে ফিরতেন গভীর রাতে। কিন্তু তিনি সাঁতার কাটতে খুব ভালোবাসতেন। তাই গুলশানে লক্ষ্মীকুঞ্জ তৈরির সময় বাড়ির বড় একটা অংশজুড়ে সুইমিংপুল তৈরি করা হয়। সুইমিংপুলে অবসর সময় আব্বা সাঁতার কাটতেন। কখনো পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধব কিংবা বিদেশি ডেলিগেটদের নিয়ে সাঁতার কাটতেন তিনি। সে সময়ের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সুইমিংপুল যিনি ডিজাইন করেছিলেন তাকে দিয়েই আমাদের বাড়ির সুইমিংপুলটি ডিজাইন এবং নির্মাণ করা হয়েছিল। সুইমিংপুলটি তৈরি করা হয়েছিল ‘আর (জ)’ আকৃতিতে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্বা আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি যখন দেশের বাইরে যেতাম বা বাইরে থেকে আসতাম তখন বিমান আমার বাড়ির ওপর দিয়ে যেত। তখন আমি নিজের বাসাটা দেখার চেষ্টা করলে এই আকৃতির কারণে সুইমিংপুলটা স্পষ্ট বোঝা যেত ওপর থেকে।’ তবে দুর্ভাগ্যবশত এই সুইমিংপুলটা আমার জন্মের কয়েক বছর পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ আমি সেখানে নামলে উঠতে চাইতাম না। আর একবার সেখানে ডুবে প্রায় মারা যাচ্ছিলাম বলে এমন সিদ্ধান্ত নেন আব্বা।
খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন আব্বা। আব্বার পাঁচটি পোষা কুকুর ছিল। সেগুলোর পরিচর্যাও করতেন। রাতে কুকুরগুলো ছেড়ে দিতেন, সারা বাসা ছুটত সেগুলো। তিনি তার এই আদরের কুকুরগুলো নিয়ে মাঝেমধ্যে খুব কাছের মানুষদের সঙ্গে মজা করতেন। আব্বা তাদের রাতে ডাকতেন। আড্ডা শেষে তারা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেই আব্বা কুকুরগুলো ছেড়ে দিতেন বাড়ির বাইরের বাগানে। তখন এই কুকুরের ভয়ে অতিথিরা আর বাসা থেকে বের হতে পারতেন না। বাধ্য হয়ে বাসায় রাত কাটাতেন তারা।
আব্বা ছিলেন খুবই বন্ধুবৎসল। বন্ধুরা বাসায় এলে আব্বা খুশি হতেন। মাছ ধরতে পছন্দ করতেন আব্বা। সুযোগ পেলেই বন্দুক নিয়ে পাখি শিকার করতে বেরিয়ে যেতেন। ঘুঘু আর বক পাখি শিকার করা ছিল তার শৌখিনতা। বিদেশ গেলে প্রচুর শপিং করতেন আমাদের জন্য। সেই সঙ্গে বাসা সাজানোর জন্য অনেক ছোট ছোট জিনিস নিয়ে আসতেন। কেনাকাটা করতে পছন্দ করতেন।
আব্বা ছিলেন ভীষণ পরিবারকেন্দ্রিক। পরিবারকে আব্বা সময় দিতেন। পরিবারকে ভালোবাসতেন। কাজে ভীষণ ব্যস্ত থাকলেও পরিবারকে সময় দিতেন। পারতপক্ষে শুক্রবার কোনো শুটিং রাখতেন না, বাসায় থাকতেন। এদিন খুঁটিনাটি বিভিন্ন কাজ করতেন। দেখা যেত বাসার ওয়ালে রং করাচ্ছেন। বাগানের পরিচর্যা করতেন। নার্সারি থেকে গাছ এনে লাগাতেন, শিকারের আর্মসগুলো পরিষ্কার করতেন, মাছ শিকারের জন্য বড়শির ছিপ ঠিকঠাক করাসহ আরও অনেক কিছু করতেন। আমাকে সঙ্গে নিয়ে জুমার নামাজ পড়তে যেতেন আজাদ মসজিদে।
এখানে একটা মজার কথা বলি- বন্ধের দিন সবাই আনন্দে থাকলেও আমি খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কারণ ওইদিন আব্বা নিজ হাতে আমাকে গোসল করিয়ে দিতেন। শ্যাম্পু ব্যবহার করতে চাইতাম না, চোখ জ্বালা করত বলে চিৎকার করতাম। এ জন্য আব্বার বকা খেতে হতো আমাকে। ওই ভয়েই আমি বন্ধের দিন একটু পালিয়ে থাকতে চাইতাম। বন্ধের দিন প্রযোজক-পরিচালকরা একের পর এক আসতেন। বাসার লনে দুটি কুঁড়েঘর ছিল, সেখানে বসে তাদের সঙ্গে নতুন সিনেমা নিয়ে কথা বলতেন, আড্ডা দিতেন।
আব্বার সঙ্গে আমার একটা ব্যাপার নিয়ে বেশি মান-অভিমান হতো। সেটি হচ্ছে ধূমপান। আমি সিগারেটের ধোঁয়া একদম সহ্য করতে পারতাম না। আর আব্বা গাড়িতে উঠেই সিগারেট ধরাতেন। লেগে যেত দুজনের মধ্যে ঝগড়া। তবে জিততাম আমিই। কারণ বাপবেটার তর্কাতর্কির একপর্যায়ে আব্বা সিগারেটটা বাইরে ফেলে দিতেন। ডাক্তারের নিষেধ থাকার পরও ধূমপান করতেন। আমরা অনেক চেষ্টা করেও থামাতে পারিনি। ২০১৫ সালে ১৭ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর বাসায় ফিরেন আব্বা। ওই সময় আব্বার সেন্স ঠিকভাবে কাজ করত না। কখনো কখনো একটু এলোমেলো করতেন।
রাত ৯-১০টায় হঠাৎ ড্রাইভারকে বলতেন এফডিসে চলো শুটিং আছে। আবার কখনো ঠিক থাকতেন। এক দিন মামার কাছে সিগারেট চাইলেন। মামা সিগারেট দিতে রাজি না হওয়ায় ক্ষেপে যান। এরপর আমি আর ভাইয়া আব্বার সামনে হাজির হই। দারোয়ানকে বলি ৩টা সিগারেট আনতে। ৩টা সিগারেট নিয়ে আব্বার সামনে দাঁড়ালাম। একটা তাকে দিলাম আর বাকি দুটো আমি আর ভাইয়া হাতে নিলাম।
আব্বাকে বললাম, ‘শরীরের এই অবস্থার পরও যদি সিগারেট ধরান তা হলে আপনার এই দুই ছেলে সিগারেট খায় না। আজ আমরাও আপনার সঙ্গে ধূমপান করব-যদি আপনি খান।’ এ কথা শোনার পর আব্বা একটু চুপ থাকলেন, আব্বার চোখ দিয়ে পানি চলে আসল। হাতে থাকা সিগারেটটা ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। এরপর আর কখনো ধূমপান করেননি তিনি।
আব্বা শুধু সিনেমাতেই নায়করাজ ছিলেন না। বাস্তবেও রাজা ছিলেন। এখনও তার নামে ভারতে জমি রয়েছে। তিনি সব ছেড়ে ঢাকায় আসার পর কখনো সেগুলো দাবি করতে যাননি। আমাদেরও বলেছেন সেগুলোর দাবি ছেড়ে দিতে। তিনি দুই হাতে বিলাতেন। যেই আসতেন সাহায্যের জন্য খালি হাতে কাউকে ফেরত দিতেন না। অন্যের সিনেমার জন্যও নিজের পকেট থেকে টাকা দিতেন।
এমন অনেক সিনেমা আছে যেগুলোর শুটিং হয়তো মাঝপথে বন্ধ হয়ে আছে টাকার অভাবে, আব্বা সেই সিনেমার প্রযোজক বা পরিচালককে ডেকে নিয়ে এসে টাকা দিয়ে বলতেন কাওকে কিছু না জানাতে আর শুটিং শেষ করতে। যদিও সিনেমা মুক্তির পর টাকা ফেরত পেতেন কিন্তু সেটা তার কাছে বড় বিষয় ছিল না। তিনি সবসময় চাইতেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে চলতে, ভালো থাকতে। আসলে এই মানুষটিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গেলে একটি বই তৈরি হয়ে যাবে। এত এত স্মৃতি আব্বার, যখন একা থাকি মনে হলেই বুক ভারী হয়ে যায়।
আগামীকাল আব্বার জন্মদিন। উনি বেঁচে থাকলে হয়তো অনেক আনন্দ-উৎসবে কাটত দিনটি। কিন্তু সে তো আর হওয়ার নয় বরং একজন সন্তান হিসেবে তার জন্য দোয়া চাই সবার কাছে- আমার আব্বাকে যেন আল্লাহ বেহেশত নসিব করেন।
সময়ের আলো/কেএইচও