নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, গীতিকার ও নির্মাণের মহান কারিগর হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১২ সালের এদিন মাটির পৃথিবী ছেড়ে, সবাইকে কাঁদিয়ে অনন্তের পথে যাত্রা করেন এই কিংবদন্তি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিউইয়র্কের হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নিউইয়র্কের আকাশে সেদিন ছিল না কোনো চাঁদ, ছিল না মায়াবতী জ্যোৎস্না। তার চাওয়া চান্নিপসর রাতের বদলে নিউইয়র্কে সেদিন ঝকঝকে রোদ, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মতো অশ্রুসিক্ত ছিল বাংলার রাতের আকাশ। কয়েক দিন পর দেশে নিয়ে আসা হয় হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ। ২৪ জুলাই চিরনিদ্রায় শায়িত হন তার নিজ হাতে গড়া গাজীপুরের নুহাশপল্লীর লিচুতলায়।
এই মহান ব্যক্তিকে ভুলে যাওয়ার যেমন কোনো কারণ নেই, তেমন মনে রাখার মতো অসংখ্য কারণ জমা রেখে গেছেন তার সৃষ্টিকর্মে। হুমায়ূন নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন কোটি লোকের হৃদয়ে। আজ ভক্ত-অনুরাগীরা হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করছে শ্রদ্ধাভরে। তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ নুহাশপল্লীতে থাকছে নানা আয়োজন। পাশাপাশি লেখকের জন্মস্থানসহ সারা দেশেই থাকছে হুমায়ূন ভক্তদের নানা অনুষ্ঠান।
বাবা শহিদ ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়শা ফয়েজের ঘর আলো করে ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। রসায়ন শাস্ত্রের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের পরপরই হুমায়ূন আহমেদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সাড়া ফেলে ‘শঙ্খনীল কারাগার’সহ আরও বেশ কয়েকটি উপন্যাস। এসবের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে শক্তিশালী এক কথাসাহিত্যিকের আগমনি জানিয়েছিলেন তিনি। তার প্রকাশিত সাহিত্যকর্ম তিন শতাধিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘দেয়াল’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘গল্প’, ‘কবি’, ‘লীলাবতী’, ‘গৌরীপুর জংশন’, ‘এই সব দিনরাত্রি’ ইত্যাদি। গল্প বলার এক নতুন ধারায় তার সব গল্প-উপন্যাসই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
একসময় সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি মনোনিবেশ করেন চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণে। টিভি নাট্যকার হিসেবেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। আশি দশকের মাঝামাঝি তার রচিত প্রথম ধারাবাহিক টিভি নাটক ‘এই সব দিনরাত্রি’ তাকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। অসংখ্য নাটক নির্মাণের পাশাপাশি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ উল্লেখযোগ্য। সংখ্যায় বেশি না হলেও হুমায়ূন আহমেদ রচিত গানগুলোও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উপন্যাসে ও নাটকে তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো বিশেষ করে ‘হিমু’, ‘মিসির আলী’, ‘শুভ্র’ তরুণ-তরুণীদের কাছে হয়ে ওঠে অনুকরণীয়। তার অসামান্য সাহিত্যকীর্তি বাঙালি ও বাংলাদেশের সম্পদ।
সাহিত্যে অবদানের জন্য হুমায়ূন আহমেদ একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদকসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন।
সময়ের আলো/এসএকে