সৌদি আরবে বিদেশি নাগরিকদের সম্পত্তি কেনার সুযোগ দিতে প্রণীত আইনের বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করেছে দেশটির রিয়েল এস্টেট জেনারেল অথরিটি (আরইজিএ)। নতুন এই বিধিমালার আওতায় বিদেশি মালিকানাধীন সব ধরনের সম্পত্তির ওপর মোট ১০ শতাংশ ফি ও কর আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
এর আগে সৌদি সরকার ‘ভিশন ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে জানিয়েছিল, রিয়াদ ও জেদ্দার মতো বড় শহরে বিদেশিরা সম্পত্তি কিনতে পারবেন। তবে আরইজিএর ঘোষিত নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে, এই সুযোগের সঙ্গে একাধিক কঠোর শর্ত ও নিয়ন্ত্রণমূলক বিধান যুক্ত থাকবে।
কঠোর তথ্য প্রকাশ ও শাস্তির বিধান
গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন নিয়মে বিদেশি ক্রেতাদের নিবন্ধিত মালিকানার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও আর্থিক সব তথ্য সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে হবে। কোনো বিদেশি নাগরিক যদি মিথ্যা তথ্য, ভুয়া ঘোষণা বা গোপন পরিচয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি কিনে থাকেন, তবে সেই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে প্রকাশ্য নিলামে তোলা হবে।
এছাড়া আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ কোটি সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, যা এ খাতে নজিরবিহীন কঠোর শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কারা এবং কোথায় সম্পত্তি কিনতে পারবেন
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, পাঁচ ধরনের বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সৌদি আরবে সম্পত্তি কেনার যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা হলেন—বিদেশি ব্যক্তি, বিদেশি প্রতিষ্ঠান, বিদেশি শেয়ারহোল্ডার রয়েছে এমন সৌদি কোম্পানি, অলাভজনক সংস্থা এবং কূটনৈতিক মিশন।
এই শ্রেণির ক্রেতারা আরইজিএ নির্ধারিত এলাকাগুলোতে আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক সম্পত্তি কিনতে পারবেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রিয়াদ, জেদ্দা, মক্কা, মদিনাসহ অন্যান্য শহরের জন্য আলাদা মানচিত্র ও বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে।
বাড়ি কিনতে কী করতে হবে
যেসব বিদেশি বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তারা নিজেদের ইকামা নম্বর ব্যবহার করে সরকারি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সরাসরি আবেদন করতে পারবেন। তারা নির্ধারিত এলাকার বাইরে ব্যক্তিগত বসবাসের জন্য একটি বাড়ি কেনার অনুমতিও পেতে পারেন।
অন্যদিকে, যারা সৌদি আরবের বাইরে অবস্থান করছেন—যেমন বাংলাদেশ থেকে কেউ বাড়ি কিনতে চাইলে, তাদের প্রথমে নিজ নিজ দেশে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস থেকে একটি ডিজিটাল আইডি সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সেই আইডি ব্যবহার করে অনলাইনে আবেদন করতে হবে।
কর ও আইনগত বিধান
যেকোনো সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ রিয়েল এস্টেট ট্রানজ্যাকশন ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে। ভুল তথ্য প্রদান, বেনামে সম্পত্তি কেনা বা আইনের ব্যত্যয় ঘটালে সর্বোচ্চ ১ কোটি সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।
বাড়ি কিনতে কত টাকা লাগতে পারে
রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান স্যান্ডস অব ওয়েলথ ও ইমিতিলাক গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী—রিয়াদ বা জেদ্দায় এক রুমের ফ্ল্যাট কিনতে লাগতে পারে প্রায় ১ কোটি টাকা, ২ থেকে ৩ রুমের ফ্ল্যাট কিনতে খরচ হতে পারে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং বড় বা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
তবে মক্কা ও মদিনার মতো পবিত্র শহরগুলোতে সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে বিশেষ বিধিনিষেধ বহাল থাকবে বলে আগেই জানানো হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো আবাসন খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখা। ফলে, প্রাথমিকভাবে সুযোগ ঘোষণার পর বাস্তব প্রয়োগে যে কঠোর নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে, তা থেকে স্পষ্ট, সৌদি আরবে বিদেশিদের সম্পত্তি কেনা সহজ নয়, বরং নির্দিষ্ট শর্তপূরণসাপেক্ষ একটি সীমিত সুযোগ।
/ইউএমএইচ