যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তিন শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুরু হতে যাচ্ছে এক নজিরবিহীন মামলা। ফেসবুক, গুগল ও টিকটকের মূল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা তাদের প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে ডিজাইন করেছে, যাতে শিশুরা সহজেই আসক্ত হয়ে পড়ে। বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালতে এই মামলার জন্য জুরি নির্বাচন শুরু হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হতে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিষয়ক মামলার ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই মামলার রায় তিন প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে যায়, তা হলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একই ধরনের হাজারো মামলা শুরু হওয়ার পথ খুলে যাবে। এই মামলার বিবাদী তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো- অ্যালফাবেট (ইউটিউব ও গুগল), বাইটড্যান্স (টিকটক) এবং মেটা (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম)। আদালতে মেটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হতে পারে বলেও জানা গেছে।
বাদী পক্ষের অভিযোগ, কম বয়সি শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে গিয়ে অবসাদ, খাবারে অনীহা, গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে। কেউ কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। আইনজীবীরা এই মামলায় ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত আইনি কৌশলের পথ অনুসরণ করছেন। তখন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সিগারেট নির্মাতাদের বিরুদ্ধে ‘ক্ষতিকর পণ্য’ বাজারজাত করার অভিযোগে বড় ধরনের মামলা হয়েছিল। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে বিচারপতি ক্যারোলিন কুলের আদালতে মামলার মূল শুনানি শুরু হবে।
এই মামলার প্রধান বাদী একজন ১৯ বছর বয়সি মার্কিন তরুণী। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে তার পুরো নাম প্রকাশ না করে শুধু আদ্যাক্ষর ‘কে জি এম’ ব্যবহার করা হয়েছে। তার অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির কারণে তিনি গুরুতর মানসিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের অভিযোগে আগে কখনো সরাসরি কোনো বড় সমাজমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি।
‘সোশ্যাল মিডিয়া ভিক্টিমস ল সেন্টার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ম্যাথু বার্গম্যান বলেন, ‘এটাই প্রথম, যখন কোনো সমাজমাধ্যম কোম্পানিকে শিশুদের ক্ষতি করার অভিযোগে বিচারকদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’ বার্গম্যানের নেতৃত্বাধীন আইনজীবী দল বর্তমানে প্রায় এক হাজার অনুরূপ মামলার দায়িত্বে রয়েছে। তিনি বলেন, কে জি এম ও তার পরিবার যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়াতে পেরেছে-এটাই একটা বড় অর্জন। আমরা জানি, এই লড়াই সহজ নয়। আমাদের প্রমাণ করতে হবে, এসব প্রতিষ্ঠান এমনভাবে তাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।
এই মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এখানে কনটেন্ট নয়, প্ল্যাটফর্মের ডিজাইনকেই কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে। ইন্টারনেট কোম্পানিগুলো দাবি করছে, মার্কিন ‘কমিউনিকেশনস ডেসেন্সি অ্যাক্ট’-এর ২৩০ ধারা অনুযায়ী তারা ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কনটেন্টের জন্য দায়ী নয়। তবে বাদীপক্ষের যুক্তি ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, সমাজমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে অ্যালগরিদম ও ফিচার তৈরি করেছে, যা মানুষের মনোযোগ ধরে রাখে, নোটিফিকেশন, স্ক্রলিং ও রিকমেন্ডেশন সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলে। বার্গম্যান বলেন, আমরা এটা বলছি না যে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরাতে না পারার জন্য কোম্পানিগুলো দায়ী। আমাদের অভিযোগ হলো- তারা নিজেরাই এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করেছে, যা শিশুদের মানসিকভাবে বন্দি করে রাখে।
ইতিমধ্যে স্ন্যাপচ্যাট এই মামলার বাইরে সমঝোতায় পৌঁছে গেছে। তবে শর্তগুলো প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে নর্দার্ন ক্যালিফোর্নিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফেডারেল আদালতে একই ধরনের আরও অসংখ্য মামলা ঝুলে আছে। এই মামলার রায় যদি বাদীদের পক্ষে যায়, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিল্পে এটি হবে একটি ঐতিহাসিক মোড়। তখন প্রশ্ন আর থাকবে না-‘কনটেন্ট ক্ষতিকর কি না’; বরং মূল প্রশ্ন হবে এই প্ল্যাটফর্মগুলো আদৌ কি নিরাপদভাবে তৈরি করা হয়েছিল?
সময়ের আলো/এসকে/