আরামে, ফ্যাশনে অফিস পোশাক

নিবেদিতা দাস

বর্তমান কর্মজীবনে নারী ও পুরুষ উভয়ের পোশাক ভাবনাতেই এসেছে পরিবর্তন। ফরমাল লুকের সঙ্গে আরামকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা এখন চোখে পড়ার

2026-01-27T05:19:22+00:00
2026-01-27T05:19:22+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আরামে, ফ্যাশনে অফিস পোশাক
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:১৯ এএম 
আরামে, ফ্যাশনে অফিস পোশাক। ছবি : সংগৃহীত
বর্তমান কর্মজীবনে নারী ও পুরুষ উভয়ের পোশাক ভাবনাতেই এসেছে পরিবর্তন। ফরমাল লুকের সঙ্গে আরামকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা এখন চোখে পড়ার মতো। কারণ দিনভর কাজের চাপের মধ্যে অস্বস্তিকর পোশাক শুধু মনোযোগই নষ্ট করে না, দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক সমস্যার কারণও হতে পারে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই অফিস ফ্যাশনে তৈরি হচ্ছে নতুন সমন্বয়।

নারীদের অফিস ফ্যাশন : পরিপাটি আর স্বস্তি
নারীদের অফিস ফ্যাশনে এখন সিম্পল ও এলিগ্যান্ট ধারার প্রভাব স্পষ্ট। ঝলমলে রং বা ভারী নকশার বদলে হালকা রং, পরিপাটি কাটিং আর আরামদায়ক কাপড়ই হয়ে উঠছে প্রথম পছন্দ। 

শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি কিংবা ফরমাল টপ— সব পোশাকই অফিসে গ্রহণযোগ্য, যদি তা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও কাজের ধরন অনুযায়ী হয়। অনেকেই মনে করেন, অতিরিক্ত নকশা বা খুব উজ্জ্বল রং অপ্রয়োজনীয় মনোযোগ তৈরি করে। তাই হালকা রং যেমন সাদা, বেইজ, হালকা নীল, ধূসর বা প্যাস্টেল শেড জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা উম্মে রোকসানা বলেন, ‘অফিসে আমরা এমন পোশাক চাই, যেটি দেখতেও স্মার্ট, আবার সারা দিন কাজ করেও অস্বস্তি হয় না।’ তার মতে, ট্রেন্ডের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কাপড়ের মান ও কাটিং। ভালো সুতি বা লিনেন কাপড় গরম আবহাওয়ায় যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনি পুরো দিনের কাজেও পোশাকটিকে পরিপাটি রাখে। তিনি আরও বলেন, হালকা রঙের পোশাকের সঙ্গে হালকা গহনা বা একটি ভালো ব্যাগ লুকটাকে সম্পূর্ণ করে।

স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত নারীদের পোশাক ভাবনায়ও রয়েছে বাস্তবতার ছাপ। স্কুল বা কলেজের শিক্ষকরা সাধারণত এমন পোশাক বেছে নেন, যেটিতে সহজে নড়াচড়া করা যায় এবং দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা বসে কাজ করলেও সমস্যা হয় না। এ ক্ষেত্রে হালকা শাড়ি, কটন সালোয়ার-কামিজ বা আরামদায়ক কুর্তিই বেশি জনপ্রিয়।

শিক্ষিকা তাসলিমা শাহপার বলেন, ভারী শাড়ি বা আঁটোসাঁটো পোশাকে ক্লাস নেওয়া বেশ কষ্টকর। তাই তিনি কোটা, তাঁত বা সুতি কাপড়ের হালকা শাড়ি ও আরামদায়ক সালোয়ার-কামিজকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

করপোরেট অফিস এইচআরসিতে কর্মরত সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মঞ্জুরিকা চাকমার মতে, অফিস ফ্যাশনে মার্জিত উপস্থাপনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শাড়ি এখন অনেকের পছন্দ হলেও সময় ও ঝামেলার কারণে করপোরেট পরিবেশে ফরমাল টপ, প্যান্ট কিংবা কুর্তি-পালাজোর ব্যবহার বাড়ছে। এখানে মূল বিষয় পোশাকের ফিটিং ও রঙের সামঞ্জস্য। খুব ঢিলেঢালা বা অতিরিক্ত আঁটোসাঁটো পোশাক দুটোই অস্বস্তিকর। অল্প পোশাক, অল্প গহনা, তবে সবকিছুতেই যেন থাকে পরিপাটি ভাব। আরামদায়ক জুতা, হালকা মেকআপ আর গোছানো চুল অফিস লুককে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

পুরুষদের অফিস ফ্যাশন : স্মার্টনেস ও আরাম
একসময় পুরুষদের অফিস ফ্যাশন মানেই ছিল শার্ট-প্যান্ট আর শক্ত ফরমাল জুতার চেনা দৃশ্য। রঙে সীমাবদ্ধতা, আরামের কথা ভাবার সুযোগ কম। সময়ের সঙ্গে এই ধারণা বদলেছে। এখন কর্মজীবী পুরুষরা পোশাক বাছাইয়ে আরাম, ফিটিং ও কাপড়ের মানকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফয়সাল হোসেন বলেন, ‘আগে মনে করতাম ফরমাল পোশাক মানেই কষ্টকর। এখন বুঝেছি, আরামদায়ক পোশাক পরলে কাজের মনোযোগও বাড়ে।’ তার অভিজ্ঞতায়, হালকা সুতি বা কটন-ব্লেন্ড শার্ট দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। অতিরিক্ত আঁটোসাঁটো বা ভারী কাপড়ের পোশাক গরমে যেমন অস্বস্তি তৈরি করে, তেমনি কাজের গতিও কমিয়ে দেয়।

অফিস ফ্যাশনে প্রতিষ্ঠানভেদেও পার্থক্য দেখা যায়। আইটি ও প্রযুক্তি খাতে তুলনামূলকভাবে পোশাকের স্বাধীনতা বেশি।
অনেক প্রতিষ্ঠানে ক্যাজুয়াল শার্ট, পোলো টি-শার্ট কিংবা চিনো প্যান্ট গ্রহণযোগ্য। তবে স্বাধীনতার অর্থ এলোমেলো হওয়া নয়। পরিষ্কার, আয়রন করা এবং মানানসই পোশাকই পেশাদার ইমেজ ধরে রাখে।

একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের এইচআর ম্যানেজার ইশফাকুল খান বলেন, খুব বেশি ফরমাল না হলেও পোশাক যেন অফিস সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, পোশাক কর্মীর ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। অনেক সময় ক্লায়েন্ট বা সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে পোশাকই প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে।

অফিসের জন্য হালকা রং যেমন নীল, ধূসর, বেইজ বা সাদা এখনও সবার পছন্দের তালিকায় প্রথম। এর সঙ্গে মানানসই জুতা ও বেল্ট পুরো লুকটিকে গুছিয়ে দেয়। সঠিক পোশাক যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, তেমনি দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় শরীর ও মনকে সচল রাখে।

করপোরেট, মিডিয়া ও ক্রিয়েটিভ সেক্টরের পোশাক

করপোরেট অফিসে পোশাকের ক্ষেত্রে এখনও ফরমাল লুকের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এখানে রং, কাটিং ও এক্সেসরিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিষ্কার পোশাক, মানানসই জুতা আর পরিপাটি উপস্থাপনাই করপোরেট লুকের মূল ভিত্তি। অন্যদিকে মিডিয়া ও ক্রিয়েটিভ সেক্টরে পোশাক ভাবনায় দেখা যায় কিছুটা স্বাধীনতা। সাংবাদিক, বিজ্ঞাপনকর্মী বা ডিজাইনারদের পোশাকে ব্যক্তিগত স্টাইলের ছাপ থাকলেও সেটি যেন কাজের পরিবেশে মানানসই হয়— এটিই মূল কথা।

মিডিয়া হাউসে কর্মরত শেলী আক্তার বলেন, ‘আমাদের কাজে মাঠে নামতে হয়, আবার মিটিংয়েও বসতে হয়। তাই পোশাক এমন হতে হয়, যেটি দুই জায়গাতেই মানিয়ে যায়।’

জুতা ও এক্সেসরিজ : ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ
নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই অফিস ফ্যাশনে জুতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা দিন অফিসে চলাফেরা, মিটিং বা সিঁড়ি ভাঙার জন্য আরামদায়ক জুতা প্রয়োজন। খুব উঁচু হিল বা শক্ত ফরমাল জুতা দীর্ঘমেয়াদে পা ও কোমরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই মাঝারি হিল, ফ্ল্যাট, লোফার কিংবা সফট সোলের ফরমাল জুতাই বেশি কার্যকর। 

একইভাবে এক্সেসরিজে নারীদের ক্ষেত্রে হালকা গহনা, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে একটি মানানসই ঘড়ি বা বেল্টই অফিস লুক সম্পূর্ণ করতে যথেষ্ট।

মানসিকতা ও কর্মদক্ষতা
পোশাক মানুষের মনোভাব ও আত্মবিশ্বাসে বড় প্রভাব ফেলে। আরামদায়ক ও মানানসই পোশাক কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে। চিকিৎসক ডা. সাবিনা রহমান বলেন, ‘যে পোশাকে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সেটি তার কাজের গতি ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।’

ডিজাইনার শান্তা কবিরের মতে, অফিসের পোশাক হতে হবে আরাম ও স্টাইলের ভারসাম্যপূর্ণ প্রকাশ। দীর্ঘ সময় কাজ করার জন্য কাপড়ের আরাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাই সুতি বা হালকা ব্লেন্ড কাপড় বেছে নেওয়াই ভালো। একই সঙ্গে পোশাকের কাট ও ফিট হতে হবে পরিপাটি, যেন ব্যক্তিত্ব ও পেশাদারিত্ব ফুটে ওঠে। অতিরিক্ত নকশা বা ভারী রঙের বদলে নরম রং ও সহজ ডিজাইন অফিস পরিবেশে বেশি মানানসই। আরামদায়ক পোশাক মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে আর সেই আত্মবিশ্বাসই স্টাইলের সবচেয়ে বড় অংশ।

অফিস ফ্যাশন তাই শুধু ভালো দেখানোর বিষয় নয়। এটি নিজের প্রতি যত্ন, পেশাগত সম্মান এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ। নারী বা পুরুষ, করপোরেট বা ক্রিয়েটিভ— সব সেক্টরের জন্যই কাজের জায়গায় মানানসই ফ্যাশনের মূল কথা একটাই— আরাম, পরিপাটি ভাব আর আত্মবিশ্বাস। এই তিনের সমন্বয়ই কর্মজীবনে তৈরি করে সবচেয়ে শক্তিশালী স্টাইল স্টেটমেন্ট।

এফআর


  বিষয়:   আরামে  ফ্যাশন  অফিস  পোশাক 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: