হালুয়া শবে বরাতের খাবারের তালিকায় সবচেয়ে পরিচিত নাম। সুজি, আটা বা ডাল দিয়ে তৈরি হালুয়া অনেক পরিবারেই নিয়মিত হয়ে থাকে। অনেকে মনে করেন, এই রাতে মিষ্টি খাবার তৈরি করে বিতরণ করা সওয়াবের কাজ। যদিও ধর্মীয়ভাবে নির্দিষ্ট কোনো খাবারের বাধ্যবাধকতা নেই, তবু হালুয়া ধীরে ধীরে একটি সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। রুটি ও মাংসের আয়োজনও অনেক জায়গায় দেখা যায়। বিশেষ করে গরু বা খাসির মাংস দিয়ে সাধারণ ঝোল বা কোরমা রান্না করা হয়। ইবাদতের পর পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার এই মুহূর্তগুলো অনেকের কাছেই শবে বরাতের স্মৃতির অংশ। কেউ কেউ প্রতিবেশী বা পরিচিতদের জন্য আলাদা করে খাবার পাঠান, যা এই রাতের মানবিক দিকটি ফুটিয়ে তোলে।
সেমাই বরফি
উপকরণ : সেমাই (লাচ্ছা বা সাধারণ) ১ প্যাকেট, ঘি ৩-৪ টেবিল চামচ, কনডেন্সড মিল্ক ৩/৪ টিন (স্বাদ অনুযায়ী), তরল দুধ (ঘন) ১/২ কাপ, এলাচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, বাদাম কুচি (পেস্তা/কাজু/কাঠ বাদাম) পছন্দমতো, নারকেল কোড়ানো ২ টেবিল চামচ।
প্রস্তুত প্রণালি : একটি প্যানে ঘি গরম করে তাতে সেমাই দিয়ে অল্প আঁচে ৫-৭ মিনিট ভালো করে ভাজুন যতক্ষণ না সুগন্ধি বের হয় ও রং গাঢ় হয়। ভাজা সেমাইয়ে কনডেন্সড মিল্ক, ঘন দুধ, এলাচ গুঁড়ো এবং বাদাম কুচি দিন। সব উপকরণ ভালোভাবে মিশিয়ে নাড়তে থাকুন যতক্ষণ না মিশ্রণটি প্যানের গা ছেড়ে আসে। এবার একটি ঘি মাখানো ট্রে বা পাত্রে গরম মিশ্রণটি সমানভাবে বিছিয়ে দিন। ওপরে আরও বাদাম কুচি ছড়িয়ে চামচ দিয়ে চেপে দিন। ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করুন। এরপর ছুরি দিয়ে বরফি আকারে কেটে পরিবেশন করুন।
টিপস : মুচমুচে বরফি চাইলে শুধু কনডেন্সড মিল্ক ব্যবহার করুন।
নরম বরফি চাইলে সামান্য ঘন দুধ মিশিয়ে নিন।
হাঁস ভুনা
উপকরণ : প্রথমে একটি মসলার পেস্ট বানিয়ে নিন। এ জন্য দুটি মাঝারি সাইজের পেঁয়াজ, ১ টেবিল চামচ আস্ত জিরা, ১ টেবিল চামচ আস্ত ধনিয়া ও কয়েকটি শুকনা মরিচ একসঙ্গে ব্লেন্ড করে নিন। এক কেজি হাঁসের মাংস ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। এর সঙ্গে মেশান মসলার পেস্ট। আরও মেশান দেড় টেবিল চামচ আদা বাটা, দেড় টেবিল চামচ রসুন বাটা, ১ টেবিল চামচ হলুদের গুঁড়া, স্বাদমতো লবণ ও ১ চা চামচ গরম মসলার গুঁড়া। মাংসের সঙ্গে সব মসলা ভালো করে মেখে রেখে দিন ১ ঘণ্টা। সম্ভব হলে আরও কিছুক্ষণ রাখতে পারেন। তবে এক ঘণ্টার কম রাখবেন না। ঠিকমতো ম্যারিনেশন করলে হাঁসের মাংস থেকে কোনো ধরনের বাজে গন্ধ আসবে না।

প্রস্তুত প্রণালি : চুলায় প্যান বসিয়ে ১/৪ কাপ তেল দিন। তেলে ৬টি এলাচ, ৭টি লবঙ্গ, কয়েকটি দারুচিনি ও দুটি তেজপাতা দিয়ে নেড়েচেড়ে ভেজে নিন। ১৫ সেকেন্ড ভেজে নেওয়ার পর ১ কাপ পেঁয়াজ কুচি দিন। হালকা বাদামি করে ভেজে নিন পেঁয়াজ। এই পর্যায়ে মসলা মাখা মাংস দিয়ে ভালো করে নেড়ে নিন। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে মাঝারি আঁচে ১০ মিনিট রাখুন চুলায়। এর মধ্যেই যথেষ্ট পানি বের হবে মাংস থেকে, ফলে আলাদা করে পানি যোগ করার কোনো প্রয়োজন নেই। নেড়েচেড়ে আবারও ঢেকে দিন। এভাবে ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় নিয়ে মাংস কষিয়ে নিন। মাংস যত কষাবেন তত মজা হবে। যখন তেল উঠে আসবে এবং মসলা নিচে জমে যাবে, তখন বুঝবেন যে মাংস কষানো হয়েছে। কষানোর সঠিক প্রক্রিয়ার ওপরে নির্ভর করে মাংসের স্বাদ। প্রয়োজনমতো গরম পানি দিয়ে মিডিয়াম লো করে দিন চুলার আঁচ। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। মাঝেমধ্যে নেড়ে দেবেন। ধীরে ধীরে সেদ্ধ হওয়ার ফলে মাংসের মধ্যে মসলার স্বাদ ঢুকবে পুরোপুরি। মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে গেলে এবং তেল ভেসে উঠলে কিছু পেঁয়াজ বেরেস্তা দিয়ে নামিয়ে পরিবেশন করুন হাঁস ভুনা।
বাদামের হালুয়া
উপকরণ : কাজু বাদাম/চিনা বাদাম ২ কাপ, ছানা/দুধ ২ কাপ, দারুচিনি, এলাচ ও তেজপাতা ১টি করে, চিনি দেড় কাপ, জাফরান ১ চিমটি, ঘি আধা কাপ, গুঁড়ো দুধ ১/৩ কাপ, ময়দা ১ টেবিল চামচ, কিশমিশ ১ টেবিল চামচ ও পেস্তা বাদাম সাজানোর জন্য।
প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে বাদামের খোসা ছাড়িয়ে হালকা ভেজে তিন-চার ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এরপর হাত দিয়ে ঘষে ওপরে খোসা ছাড়িয়ে নিন। এবার দুধ দিয়ে ব্লেন্ড করে নিন। ২ টেবিল চামচ দুধে জাফরান মিশিয়ে রাখুন। প্যানে ১ টেবিল চামচ ঘি গরম করে গরম মসলাগুলো দিন। বাদাম, ছানা, চিনি ও জাফরান দিন। ঘন ঘন নাড়তে থাকুন। এবার বাকি ঘি, গুঁড়া দুধ ও ময়দা দিন। ক্রমাগত নাড়তে থাকুন। হালুয়ার মতো হয়ে প্যান থেকে উঠে আসলে একটা ডিশে ঢেলে রাখুন। হাত দিয়ে চেপে চেপে ১ ইঞ্চি সমান করে চারপাশে ছড়িয়ে দিন। কিশমিশ, কাজু ও পেস্তা বাদাম দিয়ে সাজিয়ে ঠান্ডা হলে কেটে পরিবেশন করুন।
কমলার হালুয়া
উপকরণ : ২টি কমলা লেবু, ২ চা চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ৩ চা চামচ চিনি, ১ চা চামচ ঘি, পরিমাণমতো ড্রাইফ্রুটস।
প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে কমলা লেবুর রস বের করে নিন। এরপর ১টি পাত্রে কর্নফ্লাওয়ার ও কমলা লেবুর রস একসঙ্গে গুলিয়ে নিন। এরপর ফ্রাই প্যান বসান। চিনি দিয়ে তারপর পানি দেবেন। চিনিটা গলে গেলে কর্নফ্লাওয়ারের মিশ্রণটা দিয়ে দিন। আর অনবড়ত নাড়তে থাকুন। এরপর ঘি দিন। মিশ্রণটা যখন প্যানের গা থেকে উঠে আসবে গ্যাস বন্ধ করে দিন। এরপর কেকের মোল্ডের মধ্যে মিশ্রণটা ঢেলে দিন ওপরে ড্রাইফ্রুটসও দিয়ে দিন। তারপর ফ্রিজে ৩০ মিনিট রেখে দিন। এরপর চাকু দিয়ে কমলা লেবুর হালুয়া গুলি কেটে দিলেই তৈরি হয়ে গেল কমলা লেবুর হালুয়া।
গাজরের হালুয়া
উপকরণ : দেড় কেজি গাজরের কুচি বা গ্রেট করা, ২ কাপ চিনি, ২ লিটার দুধ, ৩/৪টা এলাচ, ২/৩ টা দারুচিনি, ১০-১২টা কাজু বাদাম, ৩-৪ টেবিল চামচ ঘি।
প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে নিন। এরপর গ্রেট করা গাজর দুধের মধ্যে দিয়ে ভালো করে নাড়ুন। মিডিয়াম আঁচে চুলায় নাড়তে থাকুন যতক্ষণ না গাজরের মিশ্রণটি নরম হয়ে আসছে। এবার একে একে চিনি, এলাচ, দারুচিনি দিয়ে আসতে আসতে নাড়তে থাকুন। একসময় দুধ শুকিয়ে আসলে অল্প আঁচে ঘি ঢেলে দিয়ে একবার নেড়ে নিন। হালুয়া পাত্রের সাইড থেকে সরে আসলে এবং সোনালি বাদামি রং হয়ে আসলে পাত্রটি নামিয়ে নিয়ে কাজু বাদাম কুচি দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করে নিন।
গরুর কড়াই গোশত
উপকরণ : গরুর মাংস ১ কেজি, পেঁয়াজ কুচি আধা কাপ, হলুদ ও মরিচ গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, রসুনের ২-৩টি কোয়া, রাঁধুনী মাংসের মসলা ১ চা চামচ, দারুচিনি ও এলাচ ৩-৪ টুকরো, জয়ফল ও জয়ত্রী বাটা ১ চা চামচ, টক দই ১ কাপ, টমেটো কিউব ১ কাপ, তেজপাতা ২টি, তেল ১ কাপ, লবণ স্বাদমতো।
প্রস্তুত প্রণালি : প্রথমে মাংস ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। একটি পাত্রে মাংস, টক দই, লবণ ও সব মসলা একসঙ্গে ভালো করে মেখে ২০ মিনিট মেরিনেট করে রাখুন। এবার হাঁড়িতে তেল গরম করে দারুচিনি, এলাচ, তেজপাতা, অর্ধেক পেঁয়াজ কুচি নিয়ে হালকা বাদামি করে ভেজে নিন। তারপর মেরিনেট করা মাংস দিয়ে নেড়ে কষিয়ে নিন। ৪ কাপ পরিমাণ পানি দিয়ে হালকা আঁচে রান্না করতে হবে। মাংস সিদ্ধ হয়ে মাংসের ওপর তেল ভেসে উঠলে নামিয়ে রাখুন। নতুন করে আবার তেল গরম করে বাকি অর্ধেক পেঁয়াজ কুচি, রসুনের কোয়া, টমেটো কিউব হালকা বাদামি করে ভাজুন। তারপর মাংস কড়াইয়ে দিয়ে ২-৩ মিনিট দমে রেখে নামিয়ে ফেলুন। এবার পরিবেশন করুন ইচ্ছামতো সাজিয়ে।
খেজুরের বরফি
উপকরণ : খেজুর ৩০০ গ্রাম, চিনি ৭০০গ্রাম, ঘন করা দুধ অথবা কন্ডেন্সড মিল্ক ১ কাপ, ঘি আধা কাপ, কিশমিশ আধা কাপ, পেস্তা বাদাম কুচি আধা কাপ, এলাচ ৪/৫টি, দারুচিনি ২/৩ টুকরো।
প্রস্তুত প্রণালি : খেজুরের বোটা ছাড়িয়ে ধুয়ে ৩/৪ ঘণ্টা ডুবো পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। খেজুর নরম হলে পানি থেকে তুলে ব্লেন্ডার অথবা শিলপাটায় মিহি পেস্ট করে নিন। এবার কড়িতে ঘি গরম করে খেজুরের পেস্ট ছেড়ে দিন। মৃদু আচে নাড়ুন। ভাজা ভাজা হলে এতে চিনি দিন। নেড়েচেড়ে এবার দিন ঘনকরা দুধ, এলাচ, দারুচিনি এবং অর্ধেক পরিমাণে কিশমিশ, পেস্তা বাদাম কুচি। অনবরত নাড়ুন মৃদু আচে। মিশ্রণটি আঠালো চটচটে হলে উনান থেকে নামিয়ে নিন। এবার রুটি বেলার পিড়ি অথবা থালায় একটু ঘি মেখে তাতে মিশ্রণ ঢেলে সমান করে নিন। এর ওপর বাকি কিশমিশ পেস্তা বাদাম চেপে চেপে বসিয়ে দিন। একটু ঠান্ডা হলে ছুরি দিয়ে বরফির আকারে কেটে নিন।
মুচমুচে পরোটা
উপকরণ : আটা ৪ কাপ, লবণ অল্প পরিমাণে, পানি ২ কাপ, তেল ভাজার জন্য।
প্রস্তুত প্রণালি : একটি বাটিতে আটা নিয়ে পরিমাণমতো লবণ ও নরমাল পানি দিয়ে ডো তৈরি করে নিতে হবে। এখানে গরম পানি ব্যবহার করা যাবে না। ডো একটু নরম আর সফট করে নিয়ে হাতের সাহায্যে ভালো করে মেখে ছোট ছোট বলের মতো তৈরি করে নিতে হবে। এরপর গোল বা চার কোনা করে বেলে নিতে হবে। এবার আধা চামচ সয়াবিন তেল ও একটু আটা পরোটার ওপর লাগিয়ে প্রথমে পরোটার একপাশ তুলে এনে এক মাথা পরোটার মাঝখানে এনে রাখব ওপর মাথা এনে শেষ মাথায় মিলাব এরপর একটু তেল লাগিয়ে চার কোনা করে দুই ভাজ করে নেব। এবার বেলনের সাহায্যে চার কোনা বা গোল সাইজে পারোটা বানিয়ে নেব।
বেশি পাতলা বা ভারী করা যাবে না। তাওয়া বা ফ্রাইপেন গরম করে রুটি দিয়ে দেব একটু গরম হলে অন্য পিঠ উল্টে গরম করে নেব, সয়াবিন তেল দেব, দুপাশ উল্টে খুনতি দিয়ে কিছুটা চাপ দিয়ে দিয়ে পরোটা ভেজে তুলব। গরম গরম মুচমুচে পরোটা মাংস বা ডিম পোচের সঙ্গে সকালের নাস্তার জন্য মজাদার। একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, শবে বরাতের মূল তাৎপর্য খাবারে নয় বরং ইবাদত ও আত্মশুদ্ধিতে। খাবার সেই উপলক্ষকে সুন্দর করে তোলার একটি অংশমাত্র। তাই আয়োজন হোক সাধ্যের মধ্যে, উদ্দেশ্য হোক ভাগ করে নেওয়া। হালুয়া, রুটি বা মাংস যাই হোক না কেন, যদি তা ভালো মন আর সংযমের সঙ্গে প্রস্তুত করা হয়, তবেই শবে বরাতের রাতটি পূর্ণতা পায়।