দালাল ও সিন্ডিকেট মুক্ত শ্রমবাজার নিশ্চিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকার যৌথভাবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এ প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত খরচ কমানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে এবং পাসপোর্ট বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দালালদের কাছে না রেখে সরাসরি কোম্পানির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে দীর্ঘদিনের দালালনির্ভরতা ভাঙতে নতুন যুগে পা রাখতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার সরকার। যেখানে থাকবে না তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্বত্বভোগী। এদের বাদ দিয়ে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় সরাসরি বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পথে এগোচ্ছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানন সম্প্রতি দেশটির জাতীয় দৈনিক দ্য স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, প্রস্তাবিত বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পদ্ধতিটি এখনো চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষে বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
তিনি জানান, বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে তৃতীয় পক্ষের জড়িত থাকা মালয়েশিয়ায় একটি পুরোনো ও বহুল আলোচিত সমস্যা। এই দালালচক্র শ্রমিকদের অতিরিক্ত ফি, ঋণ-দাসত্ব ও আধুনিক দাসপ্রথার মতো শোষণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে ।
তাদের প্রস্তাবিত এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তারা সরাসরি বিদেশি শ্রমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। তবে বর্তমানে নিয়োগকর্তাকে আগে এজেন্টের সঙ্গে কথা বলতে হয়। যার ফলে শ্রমিক সত্যিই চাকরির শর্তে সম্মত কিনা তা নিয়োগকর্তা নিশ্চিত হতে পারে না। যার কারণে অনেকে অভিযোগ করেন, এক চাকরির কথা বলে এখানে এসে অন্য চাকরি করতে বাধ্য করা হয়েছে।
শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অস্বাভাবিক ‘এজেন্ট ফি’ বন্ধ করাই হবে এই নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য, বলেন দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশি ও গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়োগ ফি এক মাসের মজুরির বেশি হওয়া উচিত নয়। অথচ বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কাজ পেতে ১৬ হাজার থেকে ২৫ হাজার রিঙ্গিত, আর নেপালি নিরাপত্তারক্ষীদের ক্ষেত্রে ১০ হাজার রিঙ্গিত পর্যন্ত দিতে বাধ্য করা হয়।
তবে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে নিয়োগকর্তার চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত শ্রমিক জুটিয়ে দেওয়া হবে। পছন্দ হলে এক ক্লিকেই ভার্চুয়াল ইন্টারভিউ নেওয়া হবে। ভাষাগত সমস্যা দূর করতে এতে যুক্ত করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই); যা তাৎক্ষণিক অনুবাদ সুবিধা দেবে।
জানা গেছে, এই ব্যবস্থা হবে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) ভিত্তিক, যেখানে কোনো তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা থাকবে না। পাশাপাশি মাই ডিজিটাল ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকের পরিচয় যাচাই, বেতন প্রদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও সহজ করা হবে।
এআই-ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে জানতে চাইলে বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, সরকারকে বিদেশের শ্রমিক পাঠানোর জন্য রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির প্রয়োজন হবে। তবে মাইগ্রেশন কোর্স কমানোর জন্য সরকার ভিন্ন পথ বাছাই করতে পারে। আমরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, বাংলাদেশের রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি এবং বাংলাদেশ ওয়ার্কারের মধ্যে কোনো মিডেল ম্যান যাতে না থাকে সেজন্য একটি অ্যাপ তৈরি করা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর জন্য একটি ডাটাবেজ তৈরি করে অ্যাপের মাধ্যমে গভমেন্টের ডাটাবেজে সরাসরি রেজিস্ট্রেশন করবে। সেই রেজিস্ট্রেশন নিয়ে রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি নিয়ে তাকে মালয়েশিয়া পাঠাতে পারে, তাহলে কোনো সিন্ডিকেটের দরকার হবে না এবং খরচ কমে যাবে।
এআই ব্যবহারে শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, সেক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকির কিছু নেই। তবে জানতে হবে যে শ্রমিকে পাঠানো হচ্ছে সে এআই এর সঙ্গে পরিচিত কিনা। এখানে আসলে জানা দরকার কোন প্রক্রিয়ায়, কীভাবে হবে তারা এআই ব্যবহার করে সাক্ষাৎকার নেবে। তারা যদি এআই ব্যবহারে পরিচিত না হয়, সেক্ষেত্রে রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।
রেমিট্যান্স প্রবাহে এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, এই মাইগ্রেশন কোস্ট কমে গেলে রেমিট্যান্সের জন্য আরও ভালো। সেক্ষেত্রে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে।
সময়ের আলো/কেএইচও