লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের দাবি করা মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করেও দেশে ফিরতে পারছেন না বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার আসাদুল বক্তিয়ার। মাফিয়াদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও বিমান ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে বর্তমানে লিবিয়ায় এক প্রবাসী বাঙালির আশ্রয়ে অসুস্থ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। আসাদুলকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তার পরিবার।
আসাদুল বক্তিয়ার বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের চাঁদত্রিশিরা গ্রামের আবু বক্তিয়ারের ছেলে।
পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর আত্মীয় এরফান সরদারের মাধ্যমে বৈধভাবে ভিজিট ভিসায় লিবিয়ায় যান আসাদুল। দেশটির আনজারা শহরের একটি মসজিদের পাশে দর্জির (টেইলারিং) কাজ শুরু করেন তিনি। সেখান থেকে প্রতি মাসে দেশের বাড়িতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পাঠাতেন, যা দিয়ে ভালোই চলছিল তার পরিবার।
চলতি বছরের ৯ রমজান সেহরি খাওয়ার পর বাসা থেকে ৫-৬ জনের একটি সশস্ত্র মাফিয়া চক্র আসাদুলকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। মাফিয়ারা তাদের আস্তানায় নিয়ে আসাদুলকে বিবস্ত্র করে, হাত-পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। চাকু দিয়ে কুপিয়ে রক্ত জখম করা এবং হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলার মতো নৃশংস নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে বাংলাদেশে আসাদুলের পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে দাবি করা হয় ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ।
আসাদুলের দরিদ্র পরিবারের অসহায়ত্ব দেখে পরবর্তীতে মুক্তিপণের অঙ্ক ৬ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এই টাকা জোগাড় করতে পরিবারের সময় লাগে প্রায় দুই মাস। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে আসাদুলের ওপর চলে অবিরাম নির্যাতন। অবশেষে পরিবারের সদস্যরা ধারদেনা ও চড়া সুদে ৫ লাখ টাকা এবং আসাদুলের স্ত্রী নিপা বেগমের বাবার বাড়ি থেকে ১ লাখ টাকা মিলিয়ে মোট ৬ লাখ টাকা মাফিয়াদের দেওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠান। টাকা পাওয়ার পর গত ২০ মে রাতে আসাদুলকে চোখ বেঁধে রাস্তায় ফেলে যায় মাফিয়ারা।
রাস্তায় পড়ে থাকা গুরুতর অসুস্থ আসাদুলকে উদ্ধার করেন সুমন নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশি। তিনি আসাদুলকে নিজের বাসায় আশ্রয় দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে দুই মাস ধরে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মাফিয়াদের নির্যাতনে আসাদুলের শরীর ক্ষতবিক্ষত ও তিনি গুরুতর অসুস্থ। বাংলাদেশ থেকে ওষুধ পাঠানো হলেও তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে ফেরার জন্য বিমান ভাড়া বাবদ প্রয়োজনীয় দেড় লাখ টাকা জোগাড় করতে না পারায় তিনি লিবিয়াতেই আটকে আছেন।
এদিকে স্বামীকে মুক্ত করতে গিয়ে সম্পূর্ণ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে আসাদুলের পরিবার। ৭ ও ১১ বছর বয়সী দুটি শিশু সন্তান এবং বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে বর্তমানে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে আসাদুলের স্ত্রী নিপা বেগমের।
নিপা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, টাকা দিয়ে স্বামীকে তো মুক্ত করলাম, কিন্তু এখন দেশে ফিরিয়ে আনার বিমান ভাড়াটুকুও আমাদের কাছে নেই। টাকার অভাবে লিবিয়াতে তিনি বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। আমরা বিভিন্ন দফতরে লিখিতভাবে জানিয়েও কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমার স্বামীকে জীবিতাবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনতে আমি সরকার ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সময়ের আলো/জোই