বৃদ্ধ বয়সে আর সংসারের ভার বইতে পারছিলেন না মো. কবির হোসেন। সংসারের হাল ধরতে জীবিকার তাগিদে একমাত্র ছেলে মো. সাইফুল মিয়াকে (২৮) পাঠিয়েছিলেন সৌদি আরবে। আশা ছিল, ছেলে এবার সংসারের দায়িত্ব নেবে আর তিনি বিশ্রাম পাবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, প্রবাস জীবনের মাত্র ৬ মাসের মাথায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন সাইফুল। এখন অর্থের অভাবে এক মাস পার হলেও তার মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
নিহত সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধ্যম তালবাড়িয়া গ্রামের মো. কবির হোসেনের ছেলে। চার বছর আগে বিয়ে করা সাইফুলের কোনো সন্তান নেই।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবের তায়েফ শহরে যান সাইফুল ইসলাম। সেখানে তিনি ছাগল পালনের কাজ করতেন। গত ১৯ জুন রাতে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে তিনি মারা যান। একই দিন বিকেলে দেশে থাকা পরিবারের কাছে এই দুঃসংবাদ আসে।
মৃত্যুর পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও সাইফুলের মরদেহ এখনো সে দেশের হাসপাতালের মর্গে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। দেশ থেকে ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠানো হলেও মরদেহ আনার কোনো সুরাহা হয়নি।
সাইফুল মিয়ার বোন আসমা আক্তার বলেন, আমার ভাইকে তার শ্বশুর মো. ইউনুস সৌদি আরব নিয়ে গিয়েছিলেন। গত ১৯ জুন খবর আসে ভাই ঘুমের মধ্যে মারা গেছে। মরদেহ দেশে আনার জন্য সব কাগজপত্র দূতাবাসে পাঠিয়েছি। কিন্তু দূতাবাস থেকে বলা হচ্ছে, মরদেহ দেশে পাঠাতে হলে সেখানকার কোনো বৈধ প্রবাসীকে দায়িত্ব নিতে হবে। আমার ভাইয়ের শ্বশুরের কাছে বৈধ কাগজপত্র (আকামা) না থাকায় তিনি দায়িত্ব নিতে পারছেন না। এছাড়া মরদেহ দেশে আনার মতো বিমান ভাড়াও আমাদের নেই।
তিনি আরও বলেন, আমার একমাত্র ভাই। আমাদের আর কোনো ভাই নেই। প্রবাসীদের কাছে অনুরোধ, দয়া করে আমার ভাইয়ের লাশটা দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় পাগলপ্রায় মা জাহানারা বেগম। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, আমি আর কিছু চাই না। শুধু আমার ছেলেটারে শেষবারের মতো একবার দেখতে চাই। যেভাবে হোক আমার বাজানরে বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করে দিন।
কৃষক বাবা কবির হোসেন বলেন, ধারদেনা করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলাম। আশা ছিল ছেলে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সরকারের কাছে আকুতি জানাচ্ছি, আমার ছেলের মরদেহ যেন দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।
সাইফুলের স্ত্রী রিয়া মনি বলেন, মারা যাওয়ার আগে রাতেও আমার সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়েছিল। ও বলেছিল ঘুমিয়ে পড়বে। সকালে কাজে যাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করেও যখন ও উঠছিল না, তখন দেখা যায় ও মারা গেছে। প্রথম দিকে ওখানকার মালিকের (কফিল) সঙ্গে কথা হয়েছিল, কিন্তু এখন সে আর ফোন ধরছে না।
স্থানীয় সমাজকর্মী মেজবাউল আলম বলেন, কবির হোসেন অত্যন্ত কষ্ট করে ছেলেকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মাস পার হলেও মরদেহ দেশে না আসাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বাংলাদেশ দূতাবাস ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার জানান, বিষয়টি আগে আমাদের কেউ জানায়নি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাইফুল মিয়ার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি উদ্যোগ ও সহযোগিতা করা হবে।
সময়ের আলো/জোই