ইউরোপের দেশ স্পেন অবৈধ বা অনিয়মিত অবস্থায় সেদেশে থাকা পাঁচ লাখের বেশি অভিবাসীকে নিয়মিতকরণের ঘোষণা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। আগামী এপ্রিল থেকে এই ডিক্রির অধীনে আবেদন গ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে৷
গত ২৭ জানুয়ারি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট জোট সরকার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে একটি যুগান্তকারী রয়্যাল ডিক্রি অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে অনিয়মিত অভিবাসীদের একটি বড় অংশকে বৈধতার আওতায় আনার পথ খুলে যায়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা বহু অভিবাসী এখন আবেদনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
গত সপ্তাহের শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ৪৬ সেকেন্ডের এক ভিডিও বার্তায় ইংরেজিতে বক্তব্য দেন সানচেজ৷ সেখানে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বলছেন আমরা স্রোতের বিপরীতে যাচ্ছি৷ কিন্তু অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া কবে থেকে চরমপন্থা হয়ে গেল? আর সহানুভূতি কবে থেকে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো?’
ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন নিয়মিতকরণের ঘটনা খুবই বিরল। এর আগে ইটালি, ফ্রান্স, গ্রিস এবং সর্বশেষ পর্তুগালে এ ধরনের উদ্যোগ দেখা গেলেও বর্তমানে ইউরোপজুড়ে নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া কঠোর শর্তে সীমাবদ্ধ।
ইউরোপের অনেক দেশে যখন অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তখন স্পেনের এই সিদ্ধান্ত ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে৷ তবে সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, স্পেন ‘মর্যাদা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের’ পথেই এগোচ্ছে।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই ডিক্রির মাধ্যমে যেসব মানুষ ইতোমধ্যে স্পেনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য বসবাসের একটি সুশৃঙ্খল ও আইনি পথ তৈরি হবে।
স্পেনের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দেখা গেছে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে৷ পর্তুগালে নতুন নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় গত এক বছরে অনেক অনিয়মিত অভিবাসী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। ফলে স্পেনের ঘোষণা তাদের জন্য নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে৷
ইতোমধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের নিজ নিজ কনস্যুলেটের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে৷ নিয়মিতকরণের আবেদনের জন্য পাসপোর্ট, নিজ দেশের পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ হালনাগাদ নাগরিক নথি জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা৷
এদিকে মাদ্রিদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পরিস্থিতিকে বিশেষ হিসেবে বিবেচনা করে বার্সেলোনাসহ বিভিন্ন শহরে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা চালু করেছে। এতে করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দ্রুত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন। একই ধরনের তৎপরতা ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
এই নিয়মিতকরণ মূলত তাদের জন্য, যারা দীর্ঘদিন ধরে বৈধ কাগজপত্রের অভাবে শ্রমশোষণ ও মৌলিক অধিকার বঞ্চনার শিকার হচ্ছিলেন।
সরকারি ডিক্রি অনুযায়ী, নিয়মিতকরণের আওতায় আসতে হলে আবেদনকারীদের কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। আবেদনকারীকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে স্পেনে প্রবেশ করতে হবে এবং আবেদনের সময় অন্তত টানা পাঁচ মাস স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দেখাতে হবে। স্পেন বা অন্য কোনো দেশে ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড থাকলে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।
আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করে বর্তমানে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীরাও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। পাশাপাশি যাদের বৈধতা দেওয়া হবে, তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরাও সরাসরি পাঁচ বছরের বৈধ রেসিডেন্স পারমিট পাবেন।
নিয়মিতকরণ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশভিত্তিক বিভিন্ন কমিউনিটি গ্রুপে প্রশ্নোত্তর ও তথ্য বিনিময় বাড়ছে৷ তবে ভাষাগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান আইনি সহায়তা ও ভাষা প্রশিক্ষণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে কমিউনিটি সাংবাদিক নুরুল ওয়াহিদ গণমাধ্যমকে বলেন, বৈধতা বিষয়ক ডিক্রি জারির পর এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা এক টাকার কাজের জন্য কয়েক গুণ পর্যন্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। যেখানে একটি বাংলাদেশি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিজে আবেদন করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে এর জন্য ২৫০ ইউরো পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে এখন স্পেনে আসার সুযোগ নেই। শর্ত অনুসারে এটি শুধু যারা গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে স্পেনে ছিলেন তাদের জন্য। এ কারণে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। নতুন করে কারও প্রলোভনে পড়ে এখন স্পেনে এলে বৈধতার কোনো সুযোগ থাকবে না।
অন্যদিকে, অনেক অভিবাসী সচেতনতামূলক ভিডিও ও তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করে অন্যদের সতর্ক করছেন, যাতে তারা প্রতারণার শিকার না হন। অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রীয় সেবার সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত এনজিওর অভাবে এই সুযোগে কিছু প্রতিষ্ঠান অভিবাসীদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে লাভবান হচ্ছে। খবর ইনফোমাইগ্রেন্টস।
/এমএইচআর