বিদেশি বিনিয়োগকৃত জ্বালানি খাতকে আইনসম্মত ৫ শতাংশ শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার উদ্দেশে শ্রম আইন সংশোধনের সকল উদ্যোগ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়ী ইউনিয়ন।
পাশাপাশি বিচারাধীন বিষয়ে শ্রম আইনে যে কোনো প্রকার পরিবর্তনের উদ্যোগ বন্ধ ও নির্বাচনের পূর্বে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বিবেচনায় এ উদ্যোগ বন্ধের দাবিও জানিয়েছে ইউনিয়নের নেতারা।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা সোহেল ইকবাল, সহ-সভাপতি এস এম শাহরিয়ার আবেদীন, টাল্লো বাংলাদেশ এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হারুন আল রশিদ প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়ী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘শেভরন জালালাবাদ, বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার গ্যাস ক্ষেত্র এবং টাল্লোর (বর্তমানে ক্রিস এনার্জি) বানগুরা গ্যাসক্ষেত্র থেকে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের সিংহভাগ সরবরাহ নিশ্চিত করে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন এবং টাল্লো বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন বৈদেশিক মুদ্রার বিনিয়োগকৃত জ্বালানি খাতে কর্মরত জাতীয় কর্মচারীদের আইনসম্মত ৫ শতাংশ শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে শ্রম আইন সংশোধনের অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের প্রতি তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ প্রকাশ করছে। জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে থাকার সুযোগে এমন একটি সংবেদনশীল ও শ্রমিকস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তড়িঘড়ি করে বিধি সংশোধনের অস্বাভাবিক তৎপরতা শুধু অনুচিতই নয়, বরং এটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।’
তিনি বলেন, ‘২০২২ সালে শেভরন বাংলাদেশের শ্রমিকরা ২০১৩ থেকে এখন পর্যন্ত তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশ দিতে কোম্পানির ক্রমাগত অপারগতায় হাইকোট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। সেই রিট পিটিশনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর শ্রমিকদের পক্ষে রায় দেন এবং রায়ের অনুলিপি প্রাপ্তির ৩ মাসের মধ্যে শেভরন বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় তহবিল গঠনপূর্বক কোম্পানির নিট মুনাফার ৫ শতাংশ ডব্লিউপিপিএফ পরিশোধের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে হাইকোর্ট শ্রম মন্ত্রণালয়কে এই রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। রায়ের বিরুদ্ধে শেভরন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি আপিল দায়ের করে। পরবর্তীতে উক্ত আপিলটি গত বছরের ২৮ অক্টোবর শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত পূর্ববর্তী রায়ের ওপর কোনো প্রকার স্থগিতাদেশ না দিয়ে আপিলটি নিয়মিত শুনানির জন্য পাঠান। যেহেতু সিভিল পিটিশনটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন, সেহেতু এই পর্যায়ে শ্রম বিধিমালা সংশোধনের যেকোনো উদ্যোগ সরাসরি বিচারাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার সামিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২২ সালে শ্রম বিধিমালায় একটি সংশোধনীর মাধ্যমে ১০০ ভাগ রফতানিমুখী খাতের শ্রমিকদের ডব্লিউপিপিএফ থেকে বঞ্চিত করা হয়, যা ব্যাপকভাবে একতরফা ও ন্যায়বিচারবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। আমরা জানতে পেরেছি, উক্ত সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট 'এই পরিবর্তন কেন অবৈধ হবে না' সে বিষয়ে রুল জারি করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে আমরা গত ৬ জানুয়ারি শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি এবং শ্রম বিধিমালা সংশোধনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানাই।’
নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘বৈঠকের পর আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে,কিছু অজ্ঞাত ও অস্পষ্ট স্বার্থান্বেষী মহলের অযৌক্তিক চাপের কারণে এই সংশোধনী উদ্যোগ অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়টি ন্যায্যতা দেওয়ার উদ্দেশে সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সম্পর্কে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এরপরেই গত ১২ জানুয়ারি পেট্রোবাংলা আমাদের একটি বৈঠকে ডাকে, যার এজেন্ডা আগে থেকে জানানো হয়নি। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একটি শ্রম আইন সংশোধন বিষয়ক বৈঠকে জাতীয় শ্রমিকদের ইউনিয়নের উপস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানকে উপস্থিত রাখা হয়, যা আলোচনার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বৈঠকে আমরা পেট্রোবাংলাকে স্পষ্টভাবে জানাই, জাতীয় কর্মচারীদের আইনসম্মত ডব্লিউপিপিএফের অধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশে যে কোনো আইনি পরিবর্তন বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য। জ্বালানি খাতের সংবেদনশীলতা ও ভঙ্গুরতা বিবেচনায় আমরা সরকারকে বলতে চাই, দ্রুততম সময়ে আমাদের দাবি বাস্তবায়ন না হলে কঠোর কর্মসূচির দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য হব।’
সময়ের আলো/এনএ