নদীর বুকে জন্ম, নৌকাই যাদের ঘর- প্রজন্মের পর প্রজন্ম যারা থেকেছেন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে, সেই মান্তা সম্প্রদায়ের জীবনে আসছে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। প্রথমবারের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন বরিশালের মান্তা জনগোষ্ঠীর মানুষ।
বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের লাহারহাট এলাকায় বসবাসরত ১৭৯টি মান্তা পরিবারের প্রায় চার শতাধিক মানুষের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তি ইতোমধ্যে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং দীর্ঘদিনের নাগরিক বঞ্চনার অবসান বলেই দেখছেন তারা।
মান্তা সম্প্রদায়ের সর্দার জাকির হোসেন বলেন, ‘আমাদের জীবনে এতদিন ভোট এলেও আমরা ছিলাম অদৃশ্য। কেউ আমাদের কথা জানতে চায়নি। এবার আমরা ভোটার- এটা আমাদের জন্য নতুন পরিচয়। যে প্রার্থী তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝবেন এবং নদীপাড়ের এই মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবেন, তাকেই তারা সমর্থন দেবেন।’
নতুন ভোটার আলমগীরের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র মানে শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, বরং সম্মানের পরিচয়। তিনি বলেন, ‘নৌকা নিয়ে রাতে ফিরলে পুলিশ ধরত, পরিচয় চাইত- কিছু দেখাতে পারতাম না। এখন অন্তত বলতে পারি, আমিও এই দেশের নাগরিক।’
আরও পড়ুন
বয়োজ্যেষ্ঠ সামিরন বিবির কণ্ঠে রয়েছে অন্য রকম হতাশা। নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় জীবিকা সংকটে পড়েছে মান্তা পরিবারগুলো। মৃত্যুর পর দাফনের জায়গা নিয়েও ভোগান্তির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যে আমাদের বাঁচার পথ দেখাবে, তাকেই আমরা ভোট দেব।’
বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল জানান, মান্তা সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তিনি বলেন, ‘তাদের জন্য ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না।’
এই জনগোষ্ঠীকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে দীর্ঘদিন কাজ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা চন্দ্রদ্বীপ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি। সংস্থার প্রকল্প সমন্বয়কারী মহানন্দ দাস বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মান্তাদের বোঝানো- জাতীয় পরিচয়পত্র কেন জরুরি। নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতেই আমাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মনে করেন, ‘মান্তা সম্প্রদায়কে শুধু ভোটের সময় নয়, রাজনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যেই আনতে হবে। যেসব প্রার্থী তাদের উন্নয়নের বিষয়টি ইশতেহারে গুরুত্ব দেবে, ভোটের মাঠে তারাই এগিয়ে থাকবে।’
নদীর ঢেউ পেরিয়ে এবার ব্যালট বাক্সে পৌঁছাচ্ছে মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষ- এটি শুধু একটি ভোট নয়, এটি রাষ্ট্রের মানচিত্রে তাদের দৃশ্যমান হওয়ার গল্প।
এএডি/