ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন নারী প্রার্থিরা। অন্তত ৫-৭টি আসনে নারী প্রার্থীর জয়ের বেশ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এর আগেও তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও জনপ্রতিনিধি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী। বিএনপি নেত্রী শামা ওবায়েদ, তাহসিনা রুশদীর লুনা, ফারজানা শারমিন পুতুলসহ কয়েকজন ভোটের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। ভোটের প্রচারে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা তাসনিম জারার মতো স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীও আলোচনায় উঠে এসেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাডি লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন তারা।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ১৭। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনের পর নির্বাচন কমিশন যে তালিকা দিয়েছে, সেই তালিকা অনুসারে, নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৪ জন, অর্থাৎ মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ। দলের হয়ে প্রার্থী হয়েছেন ৬৬ জন নারী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১৯ জন। তবে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে প্রার্থীদের যে হলফনামা দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকার কিছু গরমিল আছে। যেমন- রংপুর ৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরীর নাম চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে হলফনামায় নেই। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের দিন উত্তীর্ণ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের করা চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম আছে। আবার ঢাকা-১১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার বীথির নাম নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তালিকায় না থাকলেও হলফনামার চূড়ান্ত তালিকায় আছে।
দলগুলোর নারী প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ১০ জন, জাতীয় পার্টির ৬, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ২, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) ১০, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ৬, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৫, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) ৬, গণসংহতি আন্দোলনের ৪, গণফোরামের ৩, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) ৩, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ২, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ১, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) ১, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ১, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ১, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) ১, নাগরিক ঐক্যের ১, আম জনতার দলের ১ জন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ১ জন ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ১ জন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ১৯ জন। এর মধ্যে আবার নির্বাচন করা ও জনপ্রতিনিধি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে কেবল ৮-১০ জনের।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে ইসলামভিত্তিক যেসব রাজনৈতিক দল আছে, সেখানে সবচেয়ে বড় দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি এবার ২৭৬ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এর মধ্যে একজনও নারী প্রার্থী নেই। অতীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ইতিহাসও নেই জামায়াতের। একই অবস্থা জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোটেও। সেখানকার ইসলামি দলগুলোও যে আসন ভাগাভাগি করেছে সেখানে কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। এমনকি জোটে থাকা প্রচলিত ধারার অর্থাৎ, ধর্মভিত্তিক ধারার বাইরের দলগুলোর মধ্যে এনসিপি ছাড়া আর কোনো দলই জোটের ভাগাভাগিতে নারী প্রার্থী দেয়নি।
এবার নির্বাচনে একমাত্র হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করছেন মোছা. আনোয়ারা ইসলাম রানী। রংপুর-৩ আসন থেকে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি একই আসন থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন রানী।
ভোটের মাঠে প্রচারের অসমতা, সামাজিকমাধ্যমে নারীবিদ্বেষ, ধর্মীয় অপপ্রচার, নিরাপত্তাহীনতা ও সাইবার বুলিংয়ের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। ফলে পুরুষ প্রার্থীদের তুলনায় অনেকটাই অসম অবস্থান থেকে লড়াই করতে হচ্ছে নারী প্রার্থীদের। তবু সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন তারা।
নারী প্রার্থী হিসেবে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করলেও নিজের ভালো অবস্থানের কথা জানান বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ। ফরিদপুর-২ আসনের এই প্রার্থী সময়ের আলোকে বলেন, আমার আসনে ভোট সুষ্ঠু হলে এবং সব মানুষ ভোট দিতে পারলে আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। আমার আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে বেশ। তাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
নাটোর-১ আসনের বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলও ভালো অবস্থানে আছেন। প্রথমদিকে স্থানীয় বিএনপিতে গ্রুপিং থাকলেও শেষদিকে সবাই পুতুলের জন্য মাঠে নামেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, এটাই আমার প্রথম নির্বাচন। আগের অভিজ্ঞতা না থাকলেও বাবার নির্বাচন দেখে বড় হয়েছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারী হিসেবে ভোট করার চ্যালেঞ্জ অনেক। আশা করি, জনগণ তাদের প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে সংসদে পাঠাবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম ও সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা ভোটের মাঠে এগিয়ে আছেন। ঝালকাঠি-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ইসরাত জাহান ইলেন ভুট্টো। তিনি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য। ভোটে তার অবস্থাও ভালো। শেরপুর-১ আসনের বিএনপির সানসিলা জেবরীন প্রিয়াঙ্কা ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ধানের শীষে ভোট আলোচনায় আসেন। ফরিদপুর-৩ আসনে চৌধুরী নায়াব ইউসুফের শক্ত লড়াই গড়ে তুলবেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ঢাকা-১৪ আসনে মায়ের ডাকের প্রধান সমন্বয়ক সানজিদা ইসলামও বেশ আলোচনায় আছেন।
২০১৮ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বাসদ প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জেলা বাসদের সদস্য সচিব চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী। এবার সংসদ নির্বাচনে লড়াই করছেন। সময়ের আলোকে বরিশাল-৫ আসনে বাসদের এই প্রার্থী বলেন, প্রথমত আমি কোনো নারী হিসেবে ভোটে লড়াই করছি না। একজন মানুষ ও প্রার্থী হিসেবে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াই করছি। নারী ট্যাগ দিয়ে আমাকে পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই। যদি টাকা ওড়ানো না হয়, নির্ভয়ে মানুষ ভোট দিতে পারে, পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন হয় তা হলে আমিই এগিয়ে থাকব।
আরও পড়ুন
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডির প্রার্থী তানিয়া রব লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে লড়াই জমিয়ে তুলেছেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুরে আমাদের সংগঠন শক্তিশালী থাকায় এখনও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নারীরা সহযোগিতা করছে। তারা আমার পাশে আছেন। এখনও আমাকে কোনো বাধার মুখোমুখি হতে হয়নি। সবাই নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে আমার জয় অনেকটা নিশ্চিত।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির দুজন নারী প্রার্থী। তারা হলেন- ঢাকা-১৯ আসনে দিলশানা পারভীন ও ঢাকা-২০ আসনে নাবিলা তাসনিদ। তাদেরকে জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় জোট থেকে সমর্থন দেওয়ায় লড়াইয়ে দৌড়ে টিকে আছেন।
তবে সবচেয়ে আলোচিত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে জুনায়েদ আল হাবীবের (খেজুর গাছ) সঙ্গে ভোটের মাঠে শক্ত লড়াই করছেন সাবেক সংসদ সদস্য (সংরক্ষিত) ও বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা (হাঁস)। দলের বাইরে গিয়ে ভোট করায় বিএনপি থেকে হয়েছেন বহিষ্কার। তবু মাঠ ছাড়েননি।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, কেউ যেন ভোট কারচুপির স্বপ্ন না দেখে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ এলাকার মানুষ তাদের প্রতিহত করবে। ভোট সুষ্ঠু হলে তিনিই বিজয়ী হবেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের সামনের কাতারে থাকা তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন চিকিৎসক তাসনিম জারা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে তার প্রতীক ফুটবল। তাসনিম জারাও নিজ নির্বাচনি এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। ভিন্নভাবে প্রচার চালিয়ে ভোটারদের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
এএডি/