মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বুধবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। এই বৈঠকে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের ওপর চাপ দেবেন, যাতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে। আমেরিকা যাওয়ার আগে নেতানিয়াহু বলেন, তিনি প্রেসিডেন্টের সামনে ইসরাইলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো তুলে ধরবেন। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া হলে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করবে না।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এটি নেতানিয়াহুর ষষ্ঠ যুক্তরাষ্ট্র সফর, যা অন্য যেকোনো বিশ্ব নেতার তুলনায় বেশি। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ইরান ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি এবং তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেকোনো চুক্তির মধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তাদের সমর্থন বন্ধ করার বিষয় থাকতে হবে।
এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে। ট্রাম্প আগেই সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে না আসে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর বিষয়েও চিন্তাভাবনার কথা জানিয়েছেন। এর আগে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন নিয়ে ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দেন এবং সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত দেন। সে সময়ই মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়। ট্রাম্প বলেন, ইরান চুক্তি করতে আগ্রহী, তবে সামরিক বিকল্পও টেবিলে আছে।
ইসরাইলি কর্মকর্তারাও বলেছেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে ব্যর্থ হয়, তা হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিজের অতি-ডানপন্থি রাজনৈতিক মিত্রদের চাপের মুখে রয়েছেন নেতানিয়াহু। তাই তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে এমন একটি চুক্তির পক্ষে চাপ দিচ্ছেন, যাতে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো প্রতিফলিত হয়। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যান বাইম্যান বলেন, ইসরাইলের আশঙ্কা হলো ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে রাজি হতে পারেন, যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা পুরোপুরি বন্ধ করবে না। অন্যদিকে নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুলের অধ্যাপক মোহাম্মদ হাফেজ বলেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং ইসরাইলি-মার্কিন হামলার পর ইরানি সরকার এখন দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মনে করছে, এই মুহূর্তে তারা ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করতে পারবে।
নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেছিলেন। পরে আবার নতুন করে আলোচনায় বসে তার প্রশাসন। সাবেক মার্কিন কূটনীতিকদের মতে, বর্তমান উত্তেজনা সত্ত্বেও ট্রাম্প নির্বাচনের বছরে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে যেতে চাইবেন না। ইরাক ও তুরস্কে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত জেমস জেফ্রি বলেন, ইরানও বিষয়টি বোঝে। এই সফর এমন এক সময় হচ্ছে, যখন গাজায় যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ নিয়ে ইসরাইল ও হামাসের আলোচনা চলছে। হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ট্রাম্পের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইসরাইলের ইতিহাসে আর কেউ ছিল না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া দুই বছরের যুদ্ধ গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে থামে। ওই হামলায় প্রায় ১২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের অভিযানে সেখানে ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে যুদ্ধবিরতির পরও দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। দ্বিতীয় ধাপে অগ্রগতি খুব কম, যেখানে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
সময়ের আলো/এসকে/