দীর্ঘদিন গণতন্ত্রহীনতার অধ্যায় পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মুখোমুখি হচ্ছে দেশ। খালেদা জিয়া ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার প্রায় দুই দশক পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন তার ছেলে তারেক রহমান- যিনি এই ভূমিধস বিজয়ের প্রধান কারিগর।
এর আগে ২০০১ সালেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিলেন তারেক রহমান। এবার একই পরিবারের তিন প্রজন্মের রাষ্ট্র পরিচালনার বিরল নজির স্থাপিত হতে যাচ্ছে- রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান। বাবা-মা ও ছেলের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতার এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে উঠছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবারভিত্তিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুন নয়, তবে বাবা-মা ও ছেলে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসার ঘটনা বিরল। উপমহাদেশে বাবা-মা ও ছেলে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বিতীয় নজির হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। এর আগে শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট এস ডি বন্দরনায়েক, তার স্ত্রী বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েক এবং তাদের সন্তান চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা প্রেসিডেন্ট হন। ভারতে বাবা জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী, মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী ও ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে রাজিব গান্ধী অর্থাৎ জওহরলাল নেহরুর নাতি প্রধানমন্ত্রী হন। পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী ও তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী এবং পরে বেনজির ভুট্টোর স্বামী আসিফ আলি জারদারি প্রেসিডেন্ট হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু পারিবারিক ধারাবাহিকতা নয়; বরং দলীয় আদর্শ, সংগঠন ও সমর্থন ভিত্তির উত্তরাধিকারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় জিয়া পরিবারের এই উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে ২৫-৫৪ বছর বয়সি সংসদ সদস্য সবচেয়ে বেশি।
নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ। আর সবচেয়ে বেশি বয়সি বিএনপির খন্দকার মোশাররফ হোসেন। হলফনামা অনুযায়ী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর। তার বর্তমান বয়স ৭৯ বছর ৪ মাস। তিনি কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন। নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসন থেকে জয় পেয়েছেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ। তিনি পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৯৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাহবুবের রহমান শামীম পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২১ ভোট।
আরও পড়ুন
এবারের নির্বাচনে নবীন প্রার্থীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি ছিল, যা মোট প্রার্থীর অর্ধেকেরও বেশি ৫৮.২৯ শতাংশ। এবার ২৫-৩৪ বছর বয়সি প্রার্থী ৯.৪১ শতাংশ, ৩৫-৪৪ বছর বয়সি ১৯ শতাংশ প্রার্থীর আর ৪৫-৫৪ বছর বয়সসীমায় আছেন ২৯.৮৮ শতাংশ প্রার্থী। এ ছাড়া ২৪.৩৭ শতাংশ প্রার্থীর বয়সসীমা ৫৫-৬৫ বছর এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সি প্রার্থী আছেন ১৭.৩৫ শতাংশ।
বিগত প্রতিটি নির্বাচনেই প্রার্থীদের গড় বয়স ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। নবম নির্বাচনে প্রার্থীদের গড় বয়স ছিল ৭২.০১ শতাংশ, দশম নির্বাচনে ৬৬.৫২ শতাংশ, একাদশ নির্বাচনে ৬৩.৩৬ শতাংশ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যা ছিল ৫৬.৫১ শতাংশ। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো তুলনামূলকভাবে তরুণদের বেশি প্রার্থী করছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। একসময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবার তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে আসন পেয়েছে ৬৮টি। ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফলাফল পরে দেওয়া হবে। জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। শুক্রবার নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ জানান, সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ। এ হার ২৯৭ আসনের প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে। আর গণভোটে প্রদত্ত ভোটের হার ৬০.২৬ শতাংশ। ২৯৯ আসনের গণভোটের তথ্য একীভূত ফলাফলে এ হার।
২৯৭ আসনের ফলাফলে বিএনপি ২০৯, জামায়াতে ইসলামী ৬৮, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১, গণঅধিকার পরিষদ ১, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১, গণসংহতি আন্দোলন ১, খেলাফত মজলিস ১, স্বতন্ত্র ৭ আসন পেয়েছে।
এএডি/