মিত্রদের ফলে নাখোশ বিএনপি

রফিক রাফি

রাজনীতি

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের শরিক ও মিত্র দলগুলোকে আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। জোটের শরিক ও মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতারা কেউ

2026-02-15T03:24:50+00:00
2026-02-15T03:46:47+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
রাজনীতি
মিত্রদের ফলে নাখোশ বিএনপি
রফিক রাফি
প্রকাশ: রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:২৪ এএম  আপডেট: ১৫.০২.২০২৬ ৩:৪৬ এএম  (ভিজিট : ৪৪২)
প্রতীকী ছবি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের শরিক ও মিত্র দলগুলোকে আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। জোটের শরিক ও মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতারা কেউ নিজের দল ও প্রতীক বিলুপ্ত করে ধানের শীষ নিয়েছেন, কেউ বা পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। আবার কেউ নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কিন্তু বৃহস্পতিবারের নির্বাচনি লড়াই শেষে দেখা গেছে, হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া মিত্রদের বড় অংশই পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছেন। মিত্রদের এমন ফলাফলে নাখোশ মনোভাব প্রকাশ করেছেন বিএনপি নেতারা। 

বিএনপি নেতারা বলছেন, এবারের নির্বাচনে দলের শক্ত প্রার্থীদের বঞ্চিত করে মিত্রদের আসন ছেড়ে দেওয়া হয়। যারা বিদ্রোহী হয়েছে তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু মিত্র দলগুলো সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী না হওয়ায় বিএনপির সমর্থন পেয়েও তারা ভালো ফলাফল করতে পারেনি। এর জন্য কয়েকটি আসন হাতছাড়া হয়ে গেছে। ঢাকা-১২ আসনটি এর মধ্যে অন্যতম। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি মিত্রদের আসন ছেড়ে দিয়েছে কারণ আগেই তারা ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় সরকার গঠন করবে। মিত্রদলগুলো সাংগঠনিকভাবে অতটা শক্তিশালী নয়। বিশেষ করে যে আসনে তারা নির্বাচন করেছে সেই সব আসনে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা সেই সংসদীয় আসনের তৃণমূলে সেভাবে যোগাযোগও রাখেন। এ জন্য নির্বাচনে তাদের বেগ পেতে হয়েছে। এ ছাড়া মূল কারণ হচ্ছে প্রতীক। এবারের নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হলেও বিএনপির প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় মিত্র দলগুলো ফলাফলে পিছিয়ে পড়েছে। এসব আসনে বিএনপি প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে আরও কয়েকটি আসন পেত দলটি। 

আন্দোলনের শরিক দলগুলো থেকে বিএনপিতে নাম লিখিয়ে বা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়া হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে লক্ষ্মীপুর-১-এ এলডিপি বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া শাহাদাত হোসেন সেলিম ৮৬ হাজার ৮১১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির মাহবুব আলম পেয়েছেন ৫৯ হাজার ২৬৫ ভোট। মাহবুব আলম উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ভাই। 


কিশোরগঞ্জ-৫ : বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে ধানের শীষ নেওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদা পেয়েছেন ৬৬ হাজার ১১৮ ভোট। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল ৭৯ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এই আসনে জামায়াতের রমজান আলী পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৩৬ ভোট। 

কুমিল্লা-৭ : এলডিপি ছেড়ে বিএনপিতে আসা ড. রেদোয়ান আহমেদ ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৪৭ হাজার ৯২৫ ভোট। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম শাওন ৯০ হাজার ৮১৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। 

নড়াইল-২ : এনপিপি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ফরিদুজ্জামান ফরহাদ মোটেও ভালো করতে পারেননি। এই আসনে জামায়াতের আতাউর রহমান বাচ্চু ১ লাখ ১৮ হাজার ১৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। ফরহাদ হয়েছেন তৃতীয়। 

খেজুর গাছের বিপর্যয় : বিএনপির অন্যতম মিত্র জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থীদের জন্য এই নির্বাচন ছিল রীতিমতো বিপর্যয়কর। ‘খেজুর গাছ’ প্রতীক নিয়ে লড়া দলটির চারজন হেভিওয়েট প্রার্থী ধরাশায়ী হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনই পরাজিত হয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহীর কারণে। 

সিলেট-৫ : জমিয়ত সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক পেয়েছেন ২০ হাজার ৬৬০ ভোট। বিপরীতে খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল হাসান দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে ৪৪ হাজার ১৮১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এখানে জমিয়ত সভাপতি পরাজিত হওয়ার প্রধান কারণ বিএনপির বিদ্রোহী মামুনুর রশীদ ওরফে চাকসু মামুন। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ : জমিয়তের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৯২৭ ভোট। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। 

নীলফামারী-১ : জমিয়ত মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ১৬০ ভোট। এখানে জামায়াতের মাওলানা আবদুস সাত্তার ১ লাখ ৪৯ হাজার ২১৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। 

নারায়ণগঞ্জ-৪ : জমিয়তের মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ১৩৮ ভোট। এখানে জামায়াত জোটের শরিক এনসিপির আবদুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৪ হাজার ৪৮২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। এখানেও জমিয়ত প্রার্থীর পরাজয়ের পেছনে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকাকে দায়ী করা হচ্ছে। 

নিজস্ব প্রতীকে উজ্জ্বল পার্থ, সাকি ও নূর : জোটের সমর্থনে নিজস্ব দলীয় প্রতীকে লড়ে কপাল খুলেছে কয়েকজনের। তারা হলেন-ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ (ভোলা-১) ‘গরুর গাড়ি’ প্রতীকে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৬২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নজরুল ইসলাম পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৭৭৩ ভোট। 

 ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ থেকে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ‘মাথাল’ প্রতীকে ৯৫ হাজার ৩৪২ ভোট পেয়ে বড় জয় পেয়েছেন। জামায়াতের প্রার্থী মহসীন পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৯৬৭ ভোট। 

পটুয়াখালী-৩ থেকে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ‘ট্রাক’ প্রতীকে ৯৬ হাজার ৭৬৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৭৬ ভোট। 

অপরদিকে সাফল্য পাননি সাইফুল হক। ঢাকা-১২ থেকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ‘কোদাল’ প্রতীকে পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। এখানে জামায়াতের সাইফুল আলম ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। 

ধানের শীষ হাতেও ববি হাজ্জাজ ছাড়া সবাই ব্যর্থ : বিএনপির মূল প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়েও মিত্ররা জয়ের মুখ দেখতে হিমশিম খেয়েছেন। শুধু ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ভোটের মাঠে বিজয়ী হয়েছেন। ববি হাজ্জাজ (ঢাকা-১৩) ধানের শীষ নিয়ে ৮৮ হাজার ৩৮৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাওলানা মামুনুল হক পেয়েছেন ৮৬ হাজার ০৬৭ ভোট। 

ঝিনাইদহ-৪ থেকে ধানের শীষ নিয়ে মাত্র ৫৫ হাজার ৬৭০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন রাশেদ খান। এখানে জামায়াতের আবু তালিব ১ লাখ ৪ হাজার ৩১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। 

মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাস (যশোর-৫) : ধানের শীষ নিয়ে লড়লেও এখানে জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৮৭৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই আসনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদ মো. ইকবাল হোসেন কলস প্রতীকে পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৫ ভোট। মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাস হয়েছেন তৃতীয়। 

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু সময়ের আলোকে বলেন, আসন ছাড় দেওয়া হলেও বিএনপির মিত্ররা ভালো ফলাফল করতে পারেনি। কিন্তু সেইসব আসনে বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে নিশ্চিতভাবে বিএনপির আসন আরও বাড়ত। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপির জোট প্রার্থীরা ভালো ফলাফল করতে পারেনি, কারণ কিছু কিছু জায়গায় বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। যাদেরকে আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে যেসব দলগুলোর মধ্যে যারা জয়ী হয়েছে তারা এলাকায় গিয়েছে, তারা জনপ্রিয় এবং এলাকায় যোগাযোগ রেখেছে। অনেকে প্রার্থীই তৃণমূলে সেভাবে যোগাযোগ রাখেনি। 

তিনি বলেন, বিএনপির অনেক প্রার্থীও হেরেছে। কিন্তু জোটে যাওয়ার পরও বিএনপির প্রতীক ব্যবহার করতে না পারা মিত্রদের পরাজয়ের বড় কারণ বলেও মনে করেন তিনি। 

সময়ের আলো/এনএ 


  বিষয়:   মিত্রদের ফলে  নাখোশ বিএনপি 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: