জাতীয় নির্বাচনের সাম্প্রতিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট- চট্টগ্রাম বিভাগই এবার নির্ধারণ করেছে রাজনৈতিক সমীকরণের বড় অংশ। আট বিভাগের মধ্যে আসন ও ভোটের ব্যবধানে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে এই বিভাগ থেকেই। ৫৮টি আসনের মধ্যে ৫২টিতে জয় তুলে নিয়ে মোট আসনের প্রায় ৯১ শতাংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্য আকস্মিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি, প্রার্থী বাছাইয়ের কৌশল এবং ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার সক্ষমতার ফল। অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের ভাষ্য- চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবেই তাদের শক্ত ঘাঁটি, এবারের ফলাফল সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে প্রমাণ করেছে।
চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে ১৪টিতেই জয় পেয়েছে বিএনপি। এসব আসনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত জোটের তুলনায় প্রায় ৯ লাখ ১০ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে। বিপরীতে জামায়াত যে দুটি আসনে জয় পেয়েছে, সেখানে বিএনপির ঘাটতি ছিল প্রায় ৫৩ হাজার ভোট। গড় হিসাবে দেখা যায়, বিএনপি জয়ী আসনগুলোতে তাদের গড় ব্যবধান ৬৫ হাজারের বেশি। জামায়াতের জয়ী আসনগুলোতে ব্যবধান ছিল তুলনামূলক কম- প্রায় ২৬ হাজার ভোট।
সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয় এসেছে রাঙামাটিতে- ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধান। এটি সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যবধানের একটি। কক্সবাজার, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনী এবং তিন পার্বত্য জেলা- মোট সাত জেলায় একটিও আসন পায়নি জামায়াত জোট।
আরও পড়ুন
ফেনীর তিনটি আসনেই জয় পেয়েছে বিএনপি। নোয়াখালীর ছয়টির মধ্যে পাঁচটিতে তাদের জয়, যদিও হাতিয়ার আসনটি হাতছাড়া হয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে। লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজারের সব আসনেই ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। কুমিল্লার ১১টির মধ্যে ৯টি আসন গেছে বিএনপির ঝুলিতে।
বিভিন্ন আসনে লাখো ভোটের ব্যবধান শুধু সাংগঠনিক শক্তিই নয়, ভোটারদের একতরফা ঝোঁকও নির্দেশ করে। কুমিল্লা-৮, চাঁদপুর-২ ও চাঁদপুর-৫ আসনে এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। বান্দরবানেও ব্যবধান ছিল প্রায় এক লাখের কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বড় ব্যবধান প্রমাণ করে যে অনেক জায়গায় ভোট ছিল কার্যত একমুখী।
১৯৯১ সালের পর যতগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, প্রায় প্রতিটিতেই চট্টগ্রাম বিভাগে ভালো ফল পেয়েছে বিএনপি। ২০০১ ও ২০০৮ সালে লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার ও ফেনীতে সব আসন জয়ের নজির রয়েছে। তবে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি দলটি। এবারের ফলাফল সেই ধারাবাহিকতার পুনরুত্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে- সঠিক প্রার্থী নির্বাচন: স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোটের সমর্থন: কিছু জেলায় সংখ্যালঘু ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বিএনপির দিকে গেছে।
নীরব ভোটারদের সক্রিয়তা: পূর্বে ভোটে অনাগ্রহী বা নিরপেক্ষ থাকা ভোটারদের বড় অংশ এবার ভোট দিয়েছে।
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করছেন, কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলে ফলাফল আরও একপেশে হতে পারত।
চট্টগ্রাম বিভাগের এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিয়েছে। উপকূল, পার্বত্য এলাকা ও শিল্পাঞ্চল- তিন ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের অঞ্চলেই সমান সাফল্য অর্জন বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতার ইঙ্গিত বহন করে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতে চট্টগ্রাম আবারও ‘নির্ধারক অঞ্চল’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এএডি/