কক্সবাজার-৪ সংসদীয় আসন একটি অনন্য ও অঘোষিত রাজনৈতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। এ আসনে যিনি বিজয়ী হন, কেন্দ্রে সরকার গঠন করে তারই দল। স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিটিতেই এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।
মাত্র ১ হাজার ৫৪৯ ভোটের ব্যবধানে রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে বিএনপির প্রবীণ নেতা শাহজাহান চৌধুরী জয় লাভ করেন। তার দলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে আসনটি টানা ১৩ বারের মতো ‘ক্ষমতাসীন’ দলের এমপির তকমা ধরে রাখে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে রেকর্ড পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হন ৭৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ ও কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটসহ ১১৬টি কেন্দ্রে তিনি পান ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৮২ ভোট।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জেলা জামায়াতের আমির ও টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউপির টানা ২২ বছরের চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারী, যিনি বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পান ১ লাখ ২২ হাজার ৩৩ ভোট।
১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন শাহজাহান চৌধুরী। তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৮ আসন (উখিয়া-টেকনাফ-রামু) থেকে বিজয়ী হয়ে তিনি দ্বিতীয় সংসদের সবচেয়ে নবীন হুইপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এরপর থেকে ২০২৬ সালের নির্বাচন পর্যন্ত মোট ৯ বার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৯১, ১৯৯৬ (ষষ্ঠ) এবং ২০০১ সালেও তিনি জয়ী হন এবং প্রতিবারই তার দল সরকার গঠন করে।
ভূ-রাজনীতি ও রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে আলোচিত এই আসনে ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। ভোটের দিন কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হলেও বড় কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, দুই উপজেলায় মোট ভোট পড়েছে ৬৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। উপজেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শাহজাহান চৌধুরী নিজের জন্মস্থান উখিয়ায় ১ হাজার ৬৯২ ভোটে এবং টেকনাফে ১ হাজার ২৩৩ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।
বিজয়ের পর শাহজাহান চৌধুরী বলেন, তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফের সেবক হয়ে থাকতে চান এবং নুর আহমদ আনোয়ারীকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে আগ্রহী। বর্তমানে তিনি শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে নুর আহমদ আনোয়ারী নির্বাচনের পরদিন ফল পুনর্গণনার দাবি জানান।
তবে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে শাহজাহান চৌধুরীর নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করায় ফল পরিবর্তন বা স্থগিত হওয়ার আর কোনো আইনি সম্ভাবনা নেই।
কক্সবাজার-৪ আসনের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এখানকার সংসদ সদস্য সব সময় সরকারি দলেরই হয়ে থাকেন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী আব্দুল গণিও পরে জাতীয় পার্টিকে সমর্থন দেন। ১৯৭৮ সালে শহীদ জিয়ার হাত ধরে রাজনীতিতে আসা শাহজাহান চৌধুরী এবারের জয় দিয়েও সেই ১৩ বারের ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখলেন।
সময়ের আলো/আরবিএন