ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও মন্ত্রিপরিষদের শপথ গ্রহণ শেষে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় এসছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এরই মাঝে গঠিত হয়েছে মান্ত্রিসভা। জুলাই আন্দোলনের পর ১৮ মাস দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা সাবধানতা ও বিনিয়োগের আশা সত্ত্বেও নড়বড়ে হয়েছে দেশের অর্থনীতি। রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে ক্ষমতায় বসে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে নবগঠিত সরকার।
দেশের নড়বড়ে অর্থনীতির হাল ধরতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে এই সরকারকে, যার বেশিরভাগই আসতে পারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপ থেকে। যদিও নতুন সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কৌশল হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়েছে।
বিগত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার যে ‘বিনিয়োগের স্বপ্ন’ দেখিয়েছিল, বাস্তবতা বলছে সে ঝুড়ি প্রায় শূন্য। ফলে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং আসন্ন রমজানের দ্রব্যমূল্যের বাজারের দায়ভার কাঁধে নিয়েই যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে নতুন সরকারকে।
বিনিয়োগের ‘শূণ্য ঝুড়ি’ ও ১৮ মাসের খতিয়ান
বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যাবে শুধুই প্রতিশ্রুতির এক ফানুস। নানা সময়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণ এবং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর শত কোটি ডলার বিনিয়োগের খবর প্রচারিত হলেও, দিন শেষে ‘নিট ইনফ্লো’ বা প্রকৃত বিনিয়োগের খাতা হতাশার।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নীতিমালার ধারাবাহিকতা নিয়ে শঙ্কা এবং দীর্ঘমেয়াদী আস্থা সংকটের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হাত গুটিয়ে ছিলেন। এটির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে। নতুন সরকার এমন একটি অর্থনীতি পেতে যাচ্ছে, যেখানে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ স্থবির এবং শিল্পোৎপাদন ব্যাহত অবস্থায় আছে।
ঋণ দাতাদের চোখ রাঙানি
নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের পর বিজয় উৎসবের কোনো সুযোগ নেই। কারণ, দরজায় কড়া নাড়তে প্রস্তুত আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং দ্বিপাক্ষিক ঋণ প্রদানকারী দেশগুলো। বিগত সময়ে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়েই হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল, যা সাময়িক সমাধান দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের কাঁচামাল সংকট তৈরি করেছে। এখন নতুন সরকারকে একদিকে ঋণের কিস্তি শোধ করতে হবে, অন্যদিকে ডলারের সরবরাহ বাড়িয়ে আমদানি স্বাভাবিক রাখতে হবে। এতে যেদিকেই যাওয়া হোক না কেন, সিদ্ধান্তটি হবে নতুন সরকারের জন্য খুবই কঠিন।
রমজানে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
অর্থনীতির জটিল সমীকরণের চেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বেশি দেখা যাবে আসন্ন রমজান ও ঈদের বাজার। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষ নতুন সরকারের কাছে তাৎক্ষণিক স্বস্তি চাইবে। কিন্তু বাজারের পণ্য সর্বরাহ ব্যবস্থা গত ১৮ মাসে বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সাগরে ভাসছে পণ্য এবং সিন্ডিকেট দৌরাত্ম্যে নাজেহাল জনগণ।
ডলার সংকটের কারণে নিত্যপণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা নিয়ে জটিলতা এবং অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি এই দুইয়ের যাঁতাকলে বাজার ইতোমধ্যে অস্থির অবস্থায়। শপথ নেওয়ার পরদিনই নতুন সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে। কিন্তু কোষাগারে অর্থের টান এবং ব্যবসায়ীদের ওপর কঠোর হওয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি, এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রীর বড় চ্যালেঞ্জ।
খেলাপি ঋণ কমানোর চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুকিপূর্ণ দিক হলো ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ। গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকিং সংস্কারের নানা বুলি সত্ত্বেও, কার্যত তারা প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বা ‘অলিগার্কদের’ সিন্ডিকেট ভাঙতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নতুন সরকার এমন এক ব্যাংকিং ব্যবস্থা হাতে পাচ্ছে, যাতে আছে তারল্য সংকট এবং যার ভিত্তি নড়বড়ে।
সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক ‘সদিচ্ছা বনাম বাস্তবতার’ সংঘাত। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের সিংহভাগই আটকে আছে এমন সব প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে, যারা দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির অঘোষিত নিয়ন্ত্রক বলে বিবেচিত হয় জনসাধারনের কাছে। নতুন সরকার যদি খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়, তবে এই গোষ্ঠীগুলো ব্যবসায় তালা ঝুলিয়ে কৃত্রিম বেকারত্ব ও অস্থিরতা তৈরির হুমকি দিতে পারে, যা ‘টু বিগ টু ফেইল’ বা ব্ল্যাকমেইল হিসেবেও পরিচিত। অন্যদিকে, যদি ছাড় দেওয়া হয় বা আবারও ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের পুরনো পথে হাঁটা হয়, তবে আইএমএফ ও দাতা সংস্থাগুলো মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ঠেকবে তলানিতে।
সুতরাং, নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে এখন কঠিন প্রশ্ন তিনি কি দলীয় বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবেন? নাকি ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন’ সংশোধনের নামে এই লুটপাটের সংস্কৃতিকেই নতুন মোড়কে বৈধতা দেবেন? এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি শ্রীলঙ্কার মতো গভীর খাদের প্রান্তে গিয়ে থামবে।
নতুন সরকারের জন্য জরুরি ৫ পদক্ষেপ
বিগত ১৮ মাসের বিনিয়োগ খরা এবং ঋণের চাপে নুয়ে পড়া অর্থনীতিকে সচল করতে শপথ নেওয়া নতুন সরকারকে প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি পরিহার করে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ মোডে কাজ করতে হবে। নতুন সরকারের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে ৫টি করণীয় হতে পারে:
রমজান ও বাজার নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ : রমজান মাসকে সামনে রেখে দেশের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে নিত্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসি জটিলতা দ্রুততম সময়ের মধ্যে দূর করতে হবে। অবৈধ সিন্ডিকেট ও অসাধু মজুদদারদের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান নয়, বরং দৃশ্যমান এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা : ঈদকে সামনে রেখে দেশে বৈধ পদ্ধতিতে রেমিট্যান্স আসা নিশ্চিত করতে হবে। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং রিজার্ভের পতন ঠেকানো এখন অস্তিত্বের সংকট। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাথে দ্রুত আলোচনায় বসে ঋণের শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা বা কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানোর কূটনৈতিক চেষ্টা চালাতে হবে। হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের জন্য তাৎক্ষণিক প্রণোদনা বা ডলারের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি ব্যয়ে কঠোরতা : সরকারি কোষাগারের অবস্থা বিবেচনায়, বিলাসিতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ইতোমধ্যে সংসদের সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তা ইঙ্গিত দিয়েছে। নতুন করে কোনো বড় মেগা প্রকল্প বা কম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সরকারি কেনাকাটা, বিদেশ ভ্রমণ এবং পরিচালন ব্যয়ে কঠোর কাটছাঁট করতে হবে। শুধু চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করার দিকে নজর দিতে হবে, যা দ্রুত অর্থনৈতিক সুফল দেবে।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও আস্থা ফেরানো : রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার রাজনৈতিক আগ্রহ দেখাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলে স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে পারবে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ও নীতি সহায়তা : বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও আশ্বস্ত করতে হবে যে ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলেও তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা এবং লভ্যাংশ নেওয়ার নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে না। আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ মতো দ্রুত ও কার্যকরী সমাধানের দিকে আগানো প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত কাজ শুরু করতে পারেন।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
নতুন সরকার রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় এলেও অর্থনৈতিক দিক রক্ষা করা তাদের জন্য খুব সহজ হবে না। কেবল রাজনৈতিক ভাষণ দিয়ে এই অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত সংস্কার। ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফেরানো, বৈধপথে বৈদেশিক মুদ্রার ইনফ্লো, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং দ্রুততম সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।
শপথের মঞ্চ থেকে নেমে নতুন সরকারকে বুঝতে হবে, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলা এবং রমজানে স্বস্তি দেওয়া এই জোড়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে, সামনের দিনে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে।
লেখক : শামস তারেক আজিজ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/এসকে/