সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তরুণীদের চিন্তাভাবনা ও জীবনধারা বদলে গেছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম, যাদের আমরা জেন জি নামে চিনি, তারা বেড়ে উঠেছে ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া আর বিশ্বায়নের এক জটিল সংযোগের মধ্য দিয়ে। ফলে তাদের চিন্তা, পছন্দ-অপছন্দ, সম্পর্ক ও ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনা আগের প্রজন্ম থেকে অনেকটাই আলাদা। প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রজন্মের তরুণীরা শুধু চাকরি বা সংসার, এমন সরল সমীকরণে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে রাজি নন। তারা চান নিজের মতো করে জীবন গড়তে, নিজের সিদ্ধান্তে এগোতে এবং আর্থিক ও মানসিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে।
আজকের জেন জি তরুণীরা কেবল ভালো চাকরিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করেন না। তারা নিজের পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্য, আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং কাজের স্বাধীনতা নিয়ে বেশি সচেতন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নীলিমা নাজনীন বলেন, আমরা শুধু টাকার জন্য কাজ করতে চাই না। আমরা চাই এমন কাজ, যেটি আমাদের ভালো লাগবে এবং সমাজে এটির গুরুত্ব থাকবে। তার এই কথায় ফুটে ওঠে নতুন প্রজন্মের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, ক্যারিয়ার মানেই শুধু স্থায়ী চাকরি নয়, বরং নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা।
ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরুনিমা মাহাবুব বলেন, ‘আমার কাছে ক্যারিয়ার মানে শুধু একটি চাকরি না। আমি এমন কাজ করতে চাই, যেখানে শেখার সুযোগ থাকবে, নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। নিরাপদ চাকরি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাজের পরিবেশ ও ব্যক্তিগত পরিতৃপ্তি সবচেয়ে বড়।
অনেক জেন জি তরুণী এখন ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, অনলাইন ব্যবসা কিংবা স্টার্টআপের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ ইউটিউব চ্যানেল খুলছেন, কেউ ইনস্টাগ্রামে ছোট ব্যবসা চালাচ্ছেন, আবার কেউ আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করছেন। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা তাদের সাহসী করে তুলেছে।
উদ্যোক্তা পলি চৌধুরী বলেন, আমি চাকরি না করে নিজের অনলাইন ব্যবসা শুরু করেছি। শুরুতে কারও কাছ থেকে তেমন সাহায্য পাইনি। তবে এখন পরিবারও বুঝেছে, চাকরি ছাড়াও ব্যবসা করে মেয়েরা সফল হতে পারে। ক্যারিয়ার নির্বাচনে তারা পরিবার বা সমাজের প্রচলিত ধারায় বিশ্বাসী নয়। বরং তারা নিজের দক্ষতা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্যতা বাড়ছে।
একই সঙ্গে তারা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও বেশ খোলামেলা আচরণ করেন। আগের প্রজন্ম যেখানে বিষণ্নতা বা উদ্বেগ নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করত, সেখানে আধুনিক প্রজন্মের তরুণীরা কাউন্সেলিং, থেরাপি কিংবা আত্মচর্চাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা বুঝতে শিখেছেন, নিজের ভালো থাকা ছাড়া অন্য কিছুই টেকসই নয়।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। অনেকেই বিয়ে নিয়ে তাড়াহুড়া করতে চান না। তারা আগে নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিগত স্থিতি গড়ে তুলতে চান। সম্পর্কের ক্ষেত্রে জেন জি তরুণীরা সমান মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও মানসিক নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আনিকা তাবাসুম বলেন, ‘বিয়ে অবশ্যই করব, কিন্তু সেটি হবে আমার প্রস্তুতি আর সম্মতির ভিত্তিতে। শুধু বয়স হয়ে গেছে বলে নয়।’
এই প্রজন্ম সমতার জায়গায় দৃঢ় অবস্থান নেয়। কর্মক্ষেত্রে সমান বেতন, নিরাপদ পরিবেশ এবং সম্মান, এসব তাদের কাছে মৌলিক অধিকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা নানা সামাজিক ইস্যুতে সোচ্চার হন, প্রতিবাদ জানান, আবার সমর্থনও দেন। তবে সবকিছুই যে সহজ তা নয়। ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠার কারণে তুলনা করা, অনলাইন বুলিং বা অযাচিত মন্তব্যের শিকারও হতে হয় অনেককে। নিখুঁত জীবনের চাপ, সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট মানদণ্ড কিংবা সফলতার প্রতিযোগিতা তাদের মানসিক চাপে ফেলে। তবু তারা চেষ্টা করছেন নিজের মতো করে পথ বানাতে।
জেন জি তরুণীদের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বহুমুখিতা। তারা একসঙ্গে পড়াশোনা, পার্টটাইম কাজ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যক্তিগত আগ্রহের চর্চা চালিয়ে যেতে চান। কেউ গান শেখেন, কেউ ছবি আঁকেন, কেউ সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত থাকেন। জীবনের একটিমাত্র পরিচয়ে আটকে থাকতে তারা রাজি নন।
পরিবারের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক বদলেছে। তারা মা-বাবার সঙ্গে অনেক বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে চান। মতের অমিল থাকলেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলার সাহস রাখেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, এই প্রজন্মকে বুঝতে হলে তাদের স্বাধীন চিন্তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তারা প্রশ্ন করে, যুক্তি খোঁজে এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিতে চায়। সব মিলিয়ে জেন জি তরুণীরা এমন এক প্রজন্ম, যারা নিজের শর্তে জীবন গড়তে চায়। তারা স্বপ্ন দেখে, ভয় পায়, আবার নতুন করে উঠে দাঁড়ায়। তাদের পথচলায় আছে প্রযুক্তির শক্তি, সচেতনতার আলো এবং আত্মবিশ্বাসের জোর।
এই তরুণীদের ভাবনা, সংগ্রাম ও সাফল্য আমাদের সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে, নারী মানেই কেবল নির্দিষ্ট ভূমিকায় আবদ্ধ কেউ নন; তিনি নিজেই তার পরিচয়ের নির্মাতা।
সময়ের আলো/জেডআই