ভাষা আন্দোলন নিয়ে মাত্র ৩টি সিনেমা নির্মিত হয়েছে। সিনেমাগুলো হলো- ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘বাঙলা’ ও ‘ফাগুন হাওয়ায়’। ঐতিহাসিক এই আন্দোলনের ১৮ বছর পর ১৯৭০ সালে মুক্তি পায় ‘জীবন থেকে নেয়া’। এটিই ভাষা আন্দোলন নিয়ে নির্মিত প্রথম সিনেমা। সিনেমাটি প্রযোজনা ও পরিচালনা করেন প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান। অভিনয় করেন- রাজ্জাক, সুচন্দা, আনোয়ার হোসেন, শওকত আকবর, রোজী সামাদ, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল প্রমুখ।
তবে সিনেমাসংশ্লিষ্টদের মতে ‘জীবন থেকে নেয়া’কে পুরোপুরি ভাষা আন্দোলনের সিনেমা বলা যায় না। এটি মূলত ১৯৭০ সালে গণআন্দোলনের পটভূমি নিয়ে নির্মিত। সেখানে একুশে ফেব্রুয়ারির একটি অংশ রয়েছে। যাতে তুলে ধরা হয়েছে প্রভাতফেরি ও শহিদ মিনারে ফুল দেওয়ার দৃশ্য। খালি পায়ে ফুল দিতে যাওয়ার সেই দৃশ্যে বিখ্যাত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি সম্পূর্ণ বাজানো হয়। গানের ভেতরেই ভাষা আন্দোলনে শহিদদের নামও দেখিয়ে দেন জহির রায়হান।
জহির রায়হান এরপর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে আরও একটি সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। চিত্রনাট্যও সম্পন্ন করেন। এতে অভিনয় করার কথা ছিল খান আতা, সুমিতা দেবী, রহমান, শবনম, আনোয়ার, সুচন্দা, কবরীর। কিন্তু তৎকালীন সরকারের অসহযোগিতার কারণে শেষ পর্যন্ত সেটি আর নির্মিত হয়নি।
ভাষা আন্দোলনের ৫৪ বছর পর নির্মিত হয় দ্বিতীয় সিনেমা ‘বাঙলা’। শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০০৬ সালে। সিনেমাটিতে এক বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ের জীবনের গল্প এবং সে সময় পূর্ব বাংলার সামাজিক প্রেক্ষাপট, পাকিস্তানি দোসরদের শোষণ ও ভাষা আন্দোলন তুলে ধরা হয়েছে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার লেখা উপন্যাস ‘ওংকার’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটির ৩টি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন মাহফুজ আহমেদ, চিত্রনায়িকা শাবনূর ও প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি।
ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ নির্মিত সিনেমা ‘ফাগুন হাওয়ায়’ মুক্তি পায় ২০১৯ সালে। টিটো রহমানের গল্প ‘বউ কথা কও’ অবলম্বনে সিনেমাটি পরিচালনা করেন তৌকীর আহমেদ। সিনেমাটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন- সিয়াম আহমেদ, নুসরাত ইমরোজ তিশা, আবুল হায়াত, শহীদুল আলম সাচ্চু, ফজলুর রহমান বাবু ও ভারতের যশপাল শর্মা প্রমুখ।
একুশ নিয়ে অনেক নাটক নির্মিত হয়েছে। প্রথম নাটক রচনা করেন মুনীর চৌধুরী। সেটি ছিল মঞ্চনাটক। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অপরাধে ১৯৫২ সালে জেলে আটক ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, মুনীর চৌধুরীসহ অনেক লেখক, সাংবাদিক। রণেশ দাশগুপ্ত অন্য সেলে আটক মুনীর চৌধুরীকে ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি নাটক লিখে দেওয়ার অনুরোধ করে চিরকুট পাঠান। শহিদ দিবসে রাজবন্দিরাই নাটকটি মঞ্চায়ন করবেন, জেলে মঞ্চসজ্জা ও আলোর ব্যবস্থা করা যাবে না। তাই মুনীর চৌধুরীকে বলা হয়, নাটকটি এমনভাবে লিখতে হবে, যাতে খুব সহজে কারাগারেই অভিনয় করা যায়। মুনীর চৌধুরী ‘কবর’ নাটকটি লিখেন। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, রাত ১০টায় কারাকক্ষগুলোর বাতি নিভিয়ে দেওয়ার পর হ্যারিকেনের আলো-আঁধারিতে মঞ্চস্থ হয় ‘কবর’। অভিনয়ে অংশ নেন বন্দি নলিনী দাস, অজয় রায় প্রমুখ। এটি ছাড়াও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কিছু মঞ্চ ও পথনাটক হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মমতাজ উদদীনের ‘বিবাহ’, মিলন চৌধুরীর ‘যায় দিন ফাগুনের দিনে’, আসকার ইবনে শাইখের ‘দুর্যোগ’, ‘যাত্রা’ এবং শোভাময় ভট্টাচার্যের ‘একুশের ইতিবৃত্ত’।
মঞ্চের বাইরে টেলিভিশনের জন্যও ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য নাটক। সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে নাটক ‘চিঠিওয়ালা’। শফিকুর রহমান শান্তনুর রচনায় নাটকটির চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন হারুন রশীদ। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এক ব্যক্তিকে ঘিরে এগিয়েছে এর কাহিনি। এতে অভিনয় করেছেন মামুনুর রশীদ, আহসান হাবীব নাসিম ও সুষমা সরকার প্রমুখ। ভাষা দিবসে নাটকটি প্রচারিত হবে চ্যানেল আইয়ে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রচার হয় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম রচিত ‘ভাষাতেই শক্তি’। ভাষা আন্দোলনের সময়কার গল্প নিয়ে নবীন হোসেনের রচনায় ইফতিখার রুমন পরিচালনা করেন ‘খোকা ফিরবে’।
ভাষা আন্দোলনের আগে ও পরে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান। তার মধ্যে কিছু গান অমর হয়ে আজও বাঙালির মুখে মুখে সুর তোলে, হৃদয়ে জাগায় শিহরণ। ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রথম গান লেখেন ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক। ‘ভুলব না, ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটির সুর করেন নিজাম উল হক। অমর একুশের সূচনা পর্বের গান হিসেবে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৫৩ সালে একুশের প্রথম বার্ষিকী ও প্রথম শহিদ দিবসে প্রভাতফেরিতে প্রকৌশলী মোশারেফ উদ্দিন আহমদের ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল’ গানটি গাওয়া হয়। এটি প্রভাতফেরির প্রথম গান। সুর আলতাফ মাহমুদের। তবে একাধিক তথ্য মতে- ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রথম গান রচিত হয় ১৯৪৮ সালে। অধ্যাপক আনিসুল হক চৌধুরীর লেখা ‘শোনেন হুজুর/ বাঘের জাত এই বাঙালেরা/ জান দিতে ডরায় না তারা/ তাদের দাবি বাংলা ভাষা’। সুর করেন শেখ লুৎফর রহমান।
আবদুল গাফফার চৌধুরী ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে রচনা করেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি’। ভাষা আন্দোলন ঘিরে রচিত গানগুলোর মধ্যে এটিই সর্বাধিক জনপ্রিয়, যা একুশের মূল গান হিসেবে স্বীকৃত এবং এখন একুশের প্রভাতফেরির গান। এই গানটি প্রথমে সুর করেন আব্দুল লতিফ। পরবর্তী সময়ে আলতাফ মাহমুদের করা সুরটিই অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৫৪ সালের প্রভাতফেরিতে প্রথম গাওয়া হয় আলতাফ মাহমুদের সুরে এই গান। এরপর আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী অমর একুশে নিয়ে ‘রক্তে আমার আবার প্রলয় দোলা’, ‘শহিদ মিনার ভেঙেছো আমার ভাইয়ের রক্তে গড়া’সহ আরও কয়েকটি গান রচনা করেন।
‘সালাম সালাম হাজার সালাম/ সকল শহীদ স্মরণে’ ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। গানটি রচনা করেন ফজল-এ-খোদা। এতে সুর দেন কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার।
বাঙালির কথ্য ভাষায় রচিত ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে নিতে চায়’ গানটির স্রষ্টা আব্দুল লতিফ। জারির সুরের খুব সহজ ভাষায় এই গান যেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের কথা বলে। শামসুদ্দীন আহমদ রচনা করেছিলেন পল্লীগীতির স্বাভাবিক সুরে ‘তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’। ‘মোদের গরব, মোদের আশা’ বিখ্যাত গানটি লিখেন অতুলপ্রসাদ সেন। তার সুরে গানটি এ পর্যন্ত কণ্ঠে তুলেছেন অনেক শিল্পী। ‘ভাষার জন্য যারা দিয়ে গেল প্রাণ, ভুলিনি আমরা’ গানটি গেয়েছেন রুনা লায়লা। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘ও আমার এই বাংলা ভাষা’ গান বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এই গানের গীতিকার আব্দুল লতিফ। গানটির সুরও করেছেন তিনি। মাহফুজ বিল্লাহ্ শাহীর কথা এবং শেখ সাদী খানের সুর ও সংগীতে সৈয়দ আব্দুল হাদীর ‘বর্ণমালা’ গানটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
এ ছাড়া ভাষা আন্দোলন নিয়ে উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে- ঘুমের দেশে ঘুম ভাঙাতে ঘুমিয়ে গেল যারা, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি, বাংলা আমার মায়ের ভাষা এমন ভাষা আর যে নাই, সালাম আমার শহিদ স্মরণে, ভাষার জন্য জীবন হারালি, আমি বাংলা ভালোবাসি ইত্যাদি।
সময়ের আলো/আআ