৬০ বছর পার হলে মানুষের শরীরের জোর কমে যায়, আমাদের সমাজে এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত থাকলেও সম্প্রতি নতুন সংসদ সদস্য আ ন ম এহসানুল হক মিলনের ঘটনা সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। ৬৮ বছর বয়সে তার দৌড়ে ও লাফিয়ে শপথ নিতে যাওয়ার দৃশ্যটি ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, এই বয়সে হঠাৎ এমন দৌড়ঝাঁপ বা লাফ দেওয়া কি নিরাপদ, নাকি এটি বড় কোনো ঝুঁকির কারণ হতে পারে?
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও নতুন সব গবেষণা বলছে, নিয়ম মেনে করলে বয়স্কদের জন্য এমন শারীরিক তৎপরতা কেবল নিরাপদই নয়, বরং অনেক ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক।
আগে ভাবা হতো বয়স বাড়লে দৌড়ালে বা লাফালে হাড়ের ক্ষতি হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের এক বড় গবেষণায় দেখা গেছে, লাফানোর মতো ব্যায়াম হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে অভাবনীয় সাহায্য করে।
লাফ দেওয়ার সময় শরীরে যে নিয়ন্ত্রিত চাপ পড়ে, তা হাড়ের কোষগুলোকে শক্ত করে এবং হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়। আমেরিকার ন্যাশনাল অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনও হাড় মজবুত করতে এই ধরনের ব্যায়ামকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
শুধু হাড় নয়, বয়স বাড়লে পেশির শক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা রোধেও লাফানো বা দ্রুত নড়াচড়া করা খুব জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ সপ্তাহ নিয়মিত অভ্যাস করলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা বা চেয়ার থেকে ওঠার ক্ষমতা অনেক বাড়ে, যা বয়সে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ভয় কমিয়ে দেয়।
শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখার পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের উন্নতির জন্যও এমন পরিশ্রমী নড়াচড়া সহায়ক।
বিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, লাফানোর ফলে হার্টবিট বাড়ে, যা রক্ত চলাচলের গতি ঠিক রাখে এবং হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া লাফানোর সময় শরীরকে ব্যালেন্স করতে হয় বলে স্নায়ু ও পেশির মধ্যে একটি সুন্দর সমন্বয় তৈরি হয়। এতে হাঁটার সময় শরীর স্থির থাকে এবং শরীরের কাজ করার গতি বাড়ে।
আট সপ্তাহের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্র্যাকটিস করলে বয়স্কদের লাফের উচ্চতা প্রায় ১৪ শতাংশ এবং পেশির শক্তি ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এটি প্রমাণ করে যে, বয়স বাড়লেও শরীরের সক্রিয়তা ধরে রাখা সম্ভব।
তবে এই দৌড়ঝাঁপ সবার জন্য এক নয়। যাদের হাঁটু বা কোমরে তীব্র ব্যথা, হার্টের অসুখ বা ব্যালেন্সের সমস্যা আছে, তাদের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।
নিরাপদ থাকার জন্য প্রথমে হালকা ব্যায়াম বা গোড়ালি উঁচু করার অভ্যাস দিয়ে শুরু করা ভালো। এরপর ধীরে ধীরে ছোট লাফের দিকে যাওয়া উচিত। অবশ্যই নরম মেঝে বা ম্যাট এবং ভালো মানের জুতা ব্যবহার করা দরকার।
আ ন ম এহসানুল হক মিলনের এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, বয়স আসলে কেবল একটি সংখ্যা। নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে বার্ধক্যের জড়তা কাটিয়ে তারুণ্যের প্রাণচাঞ্চল্য ধরে রাখা সম্ভব। মোদ্দা কথা হলো, সক্রিয় থাকাই হলো সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের আসল চাবিকাঠি।
সময়ের আলো/আরবিএন