১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রের বুকে জন্ম নিল ছোট্ট পবিত্র যে দেশ, তার রক্তবীজ বোনা হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। কারণ বায়ান্ন আমাদের দেখিয়েছে আধিপত্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা একাত্তরে এসে গুঁড়িয়ে দিয়েছি অন্যায়কারীর সাম্রাজ্য।
তবে ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে বর্তমানে আক্ষরিক অর্থেই দুয়েকজনকে বিভ্রান্তিতে ভুগতে দেখা যায়। আমরা ভুলে যাই, ভাষা আন্দোলন ছিল ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে। কোনো ভাষার বিরুদ্ধে নয়। আমাদের ওপর যে ভাষাটা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, আমরা সেটি মেনে নিইনি, প্রত্যাখ্যান করেছি তীব্রভাবে। মায়ের ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে আমরা এক তিল পরিমাণ ছাড় দিতে সম্মত হইনি এবং তা রক্ষার জন্য বুকের উষ্ণরক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়েছি। আবারও কোনো ভাষার প্রতিই আমাদের বিরাগ নেই। আমাদের লড়াই ছিল ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে।
তার প্রমাণস্বরূপ একটি কবিতার কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। ‘অমর একুশে’ হাসান হাফিজুর রহমানের লেখা। কবি হাসান হাফিজুর রহমান আমাদের কাছে নানা কারণেই স্মরণীয়। নমস্য। তার একটি হচ্ছে একুশের প্রথম সংকলন তিনিই করেছেন এবং এ জন্য তাকে কতটুকু ত্যাগ করতে হয়েছে, সেই কাহিনি অনেকেই অবগত। তাই আর বললাম না। তার কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধার করছি।
‘আম্মা তার নামটি ধরে একবারও ডাকবে না তবে আর?
ঘূর্ণিঝড়ের মতো সেই নাম উন্মথিত মনের প্রান্তরে
ঘুরে ঘুরে জাগবে, ডাকবে,
দুটি ঠোঁটের ভেতর থেকে মুক্তোর মতো গড়িয়ে এসে
একবারও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে না, সারাটি জীবনেও না?
কি করে এই গুরুভার সইবে তুমি, কতদিন?’
দীর্ঘ একটি কবিতা। পরের পঙ্ক্তিগুলোতে শহিদদের কথা, দেশের কথা ব্যক্ত হয়েছে। তবে আমরা যে জন্য কবিতার কথা বলেছি, সেটি হলো— কবিতাটি শুরু হয়েছে ‘আম্মা’ শব্দ দিয়ে। আম্মা শব্দটি ব্যাপকভাবে উর্দু ভাষায় ব্যবহৃত হয়। যদি ভাষার বিরুদ্ধে বায়ান্নর লড়াই থাকত, তা হলে নিঃসন্দেহে কবি হাসান হাফিজুর রহমান এই শব্দটি ব্যবহার করতেন না।
আমাদের পূর্বপুরুষ কারও অকারণ আধিপত্য মেনে নিতে চায়নি।
এ ছাড়া একুশ আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গেছে, তার মধ্যে একটি হলো— শাসক চাইলেই যা খুশি বাঙালির ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। পারেনি। বাঙালি তার অধিকার আদায়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়নি। প্রয়োজনে কালো রাজপথে বুকের উষ্ণ লাল রক্ত ঢেলে দিয়েছে।
বায়ান্নতেও দেখি, ভাষা রক্ষার জন্য ঘাতকের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে দ্বিধা করেনি। পাকিস্তানিদের এই হত্যাকাণ্ডের খবর সারা দেশে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। কেঁপে ওঠে পুরো দেশ— প্রতিবাদ, বিদ্রোহে, বিক্ষোভে। ১৯৫২ সালে বাঙালি দামাল সন্তানদের অকুতোভয়ে ছবি আমরা পাই মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কবিতায়।
তিনি লিখেছেন,
‘এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়
যেখানে আগুনের ফুলকির মতো
এখানে-ওখানে জ¦লছে অসংখ্য রক্তের ছাপ
সেখানে আমি কাঁদতে আসিনি।
(কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি, মাহবুব উল আলম চৌধুরী)
কবিতাটি ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রাতেই রচিত হয়। মাহবুব উল আলম চৌধুরী তখন অসুস্থ। জলবসন্তে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। ঢাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা শুনে সে রাতেই তিনি কবিতাটি রচনা করেন। ভাষার জন্য প্রাণদানকারী শহিদদের নিয়ে লেখা প্রথম কবিতা বা সাহিত্য এটিই। রাতেই একটি প্রেসে কবিতাটি ছাপানো হয়।
পরদিন চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় কবিতাটি প্রচারপত্রের মতো বিলি করা হয়। প্রকাশের কয়েক দিন পরেই মুসলিম লীগ সরকার কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করে। এই আটকাদেশ দীর্ঘদিন থাকার ফলে হারিয়ে যায়। ১৯৮৩ সালে কবির স্মৃতি থেকে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম কবিতাটির সামান্য অংশ উদ্ধার করেন।
পরবর্তী সময়ে স্কুল শিক্ষয়িত্রী মনজুরা বেগমের মাধ্যমে মূল কবিতাটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। কবিতায় কবি তরুণ স্বপ্নবান প্রাণগুলোর জন্য ব্যথিত হয়েছেন। সেই সঙ্গে মাহবুব উল আলম চৌধুরী সেই আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন, এই যে স্বপ্নবান তরুণগুলো মায়ের ভাষার জন্য হাসিমুখে নিজের জীবন দিতে পিছপা হননি, তাদের এই ত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না। হারিয়ে যাবে না এই কণ্ঠস্বরগুলো। কখনোই না।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বছর যেতে না যেতেই ভাষার প্রশ্নে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। সেই দ্বন্দ্বই বাড়তে বাড়তে দাবানলে রূপ নেয়। যেই দাবানলকে দমন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে নিরীহ বাঙালির ওপর। শহিদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ আরও অনেকে।
মা-মাটি-ভাষা যেন একে অন্যের পরিপূরক। তাই সেদিন বাঙালি ছাত্ররা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি মেনে নিতে পারেনি। আন্দোলন করেছে। গুলির সম্মুখে হাসিমুখে বিলিয়েছে প্রাণ। ছেলে মায়ের মুখের ভাষা রক্ষা করার জন্য প্রাণ দিয়েছে, হয়তো মা জানে না। হয়তো জানে। তবু সন্তানের প্রতীক্ষা যেন ফুরায় না তার।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এমনই এক চিত্র এঁকেছেন তার ‘মাগো, ওরা বলে’ কবিতায়।
‘মাগো, ওরা বলে
সবার কথা কেড়ে নেবে।
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।
বলো, মা,
তাই কি হয়?
তাই তো আমার দেরি হচ্ছে।
তোমার জন্য
কথার ঝুড়ি নিয়ে
তবেই না বাড়ি ফিরব।
লক্ষ্মী মা,
রাগ ক’রো না,
মাত্র তো আর ক’টা দিন।’
না, এই কটা দিন আর শেষ হবে না। ফুরোবে না মায়ের প্রতীক্ষা।
কবি হাসান হাফিজুর রহমান লিখেছেন,
‘আম্মা তার নামটি ধরে একবারও ডাকবে না তবে আর?
ঘূর্ণিঝড়ের মতো সেই নাম উন্মথিত মনের প্রান্তরে
ঘুরে ঘুরে জাগবে, ডাকবে,
দুটি ঠোঁটের ভেতর থেকে মুক্তোর মতো গড়িয়ে এসে
একবারও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে না, সারাটি জীবনেও না?’
এর উত্তরও আমরা বলতে পারি— না। কেননা পাকিস্তানি ঘাতকগোষ্ঠী ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির রক্তে লাল করেছিল ঢাকার রাজপথ।
আল মাহমুদ ‘একুশের কবিতা’য় লিখেছেন—
‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত।
হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!’
বসন্তের কৃষ্ণচূড়ার মতো ঢাকার রাজপথ সেদিন রঙিন হয়ে উঠেছিল। শুধু আল মাহমুদের কবিতাতেই নয়, শামসুর রাহমানও ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’ কবিতায় কৃষ্ণচূড়াকে শহিদের স্মৃতিগন্ধে ভরপুর বলেছেন।
একুশ আমাদের চেতনার সঙ্গে মিশে গেছে। তাই তো শাসকগোষ্ঠী শহিদের স্মৃতি রক্ষার্থে মিনার ভেঙে ফেলেও আমাদের মন থেকে শহিদের স্মৃতি মুছে দিতে পারেনি। একুশ আমাদের পথ দেখিয়েছে। সাহস জুুগিয়েছে।
আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছেন,
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনও
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো!’
ঊনসত্তরের আন্দোলন কি মুক্তির সংগ্রামের একুশ আমাদের প্রেরণা দিয়েছে। তাই শামসুর রাহমান ‘স্বাধীনতা তুমি’ লিখেছেন,
‘স্বাধীনতা তুমি
শহিদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা’।
একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সাহিত্যকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। শওকত ওসমান, আবুল ফজল, মুনীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীসহ অনেক সাহিত্যিককে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রত্যক্ষ জাতক জহির রায়হান। একুশে ফেব্রুয়ারি জহির রায়হানকে দিয়ে অসাধারণ সব সৃষ্টিকর্ম তৈরি করে নিয়েছে।
ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে প্রথম উপন্যাস লেখার কৃতিত্ব জহির রায়হানের। উপন্যাস ছাড়া তিনি চমৎকার কিছু ছোটগল্প রচনা করেছেন ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে। মূলত তার লেখা নানাভাবে ভাষা আন্দোলন উঠে এসেছে।
তার ‘আরেক ফাল্গুন’ ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা প্রথম উপন্যাস। এ উপন্যাসের কাহিনি খুব বেশি বড় নয়, ঘটনা সংগঠনের স্থিতিকাল মাত্র তিন দিন দুই রাত। প্রথম দিনের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে কাহিনির শুরু। প্রথম দিন, রাত এবং দ্বিতীয় দিন ও রাত ধরে একুশ পালনের বিরামহীন প্রস্তুতির মাধ্যমে কাহিনির বিস্তার ঘটে। তৃতীয় দিন মিছিল এবং পুলিশের সংঘর্ষের মাধ্যমে উপন্যাসটি ক্লাইমেক্সের দিকে এগিয়ে গেছে। অতঃপর দিনের শেষে কারা তোরণ প্রাঙ্গণে কাহিনির সমাপ্তি হয়। উপন্যাসের শেষ লাইনটি বড় ইঙ্গিতময়। আগামী ফাল্গুনে ভাষা আন্দোলনকারীদের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার ঘোষণা উপন্যাসটিকে অশেষের ব্যঞ্জনা এনে দিয়েছে, পাশাপাশি উপন্যাসটিকে করেছে তাৎপর্যমণ্ডিত।
জহির রায়হানের ‘মহামৃত্যু’ গল্পে জনৈক নূরুর কলেজপড়ুয়া ছেলে শহীদ বছর খানেকের ওপর একই এলাকায় বসবাস করলেও কখনো কারও নজরে পড়েনি। অথচ তার মরদেহ যখন পাড়ায় নিয়ে আসা হলো, তখন মুহূর্তেই বদলে যায় এলাকার প্রাত্যহিক জীবনচিত্র। দলে দলে লোকজন দেখতে আসে মৃত শহীদকে, ছোটখাটো একটা জটলা বেধে যায়। কারণ এই মৃত্যু কোনো সাধারণ নয়, ভাষার জন্য এ মৃত্যু, মাকে মা বলে ডাকার জন্য এ মৃত্যু বড় গৌরবের, বড় পবিত্র। মহিমান্বিত এই মৃত্যু কারবালায় নিষ্ঠুর এজিদের হাতে সত্যের জন্য শহিদ হওয়া বীর ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা জহির রায়হানের সবচেয়ে তাৎপর্যমণ্ডিত এবং শিল্পসার্থক গল্প হলো ‘একুশের গল্প’। এই গল্পে দেখি, চার বছর আগে ভাষা আন্দোলনে শহিদ হওয়া তপুর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে গল্পের আরম্ভ। কপালে গুলি খেয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়লে তপুর মরদেহ গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি মিলিটারিরা। তারপর কেটে যায় চার বছর। বিয়ে হয়ে যায় তপুর স্ত্রী রেণুর, মারা যায় তপুর মা। তপুর স্মৃতি বন্ধুদের কাছেও যখন ধূসর হয়ে আসছে, তখন-ই ফিরে আসে তপু। জীবন্ত নয়, মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের গবেষণা করার কঙ্কাল হয়ে।
প্রকৃত পক্ষে জীবিত তপু ফিরে না এলেও তপুর কঙ্কাল আবিষ্কৃত হওয়ার মধ্য দিয়ে তপুর দুই রুমমেটসহ অন্যান্য অনেকের মাঝে ভেসে উঠেছে চার বছর আগের সেই স্মৃতি, হাস্যোজ্জ্বল, বন্ধুবৎসল, কর্তব্যপরায়ণ, স্বপ্নাতুর, ভাষাপ্রেমিক, দায়িত্ববান তপুর কথা। তপুর এই প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সবাই একটু একটু বললে যায়। জাগরণে, নিদ্রায়, তাদের আলোচনা, চিন্তার জায়গা দখল করে নেয় তপু। এভাবেই আমরা দেখি তপুর বিশ্বাস যখন নিশ্চিহ্ন প্রায় তখনই সহপাঠীদের মাঝে তপুর পুনর্জীবনের অঙ্কুর গজাতে।
একুশের ফেব্রুয়ারির দিন বাঙালির যে আত্মত্যাগ তা রাজনীতিতেও ফেলেছে ব্যাপক প্রভাব। এর ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। আমাদের বলতে দ্বিধা নেই, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই তৈরি করে দিয়েছিল ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার পথ।
এফআর