হ্যাজাক বাতি
স্কুলে বিচিত্রা অনুষ্ঠানের আয়োজন আর উচ্ছ্বাস দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল দুখু।
স্কুল তো কোন ছার, পুরো তল্লাট এখন সরগরম। পুরো গ্রামের মানুষ আলোড়িত। এসব স্থানে আনন্দের হুল্লোড় রোজ হয় না। এমন আনন্দঘন অনুষ্ঠানে মঞ্চে ডাক পড়ল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র দুখুর।
প্রথমে সে বাঁশের বাঁশিতে টান দিল।
বাঁশির সুরে মাতোয়ারা হয়ে উঠল দর্শক।
তারপর সে একে একে আবৃত্তি করল ‘দুই বিঘা জমি’ আর ‘পুরাতন
ভৃত্য’— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই দুটি কবিতা। শিক্ষকরা হতবাক।
পাড়ার মানুষজন উল্লসিত। এক কোণে বসে দরিরামপুরের বন্ধু নিয়ামত ভাবল— এ কী করে সম্ভব! কোনো রিহার্সেল ছাড়া, বই হাতে না নিয়ে কীভাবে দুখু এমন দরাজ কণ্ঠে আবৃত্তি করে গেল দুটি কবিতা! কীভাবে তুলল বাঁশিতে নতুন সুর! তা হলে কি সে স্বভাবকবি?
প্রতিদিনই কি মনে মনে রিহার্সেল করে?
নিজের দক্ষতার জয়গান কি এভাবেই বুনে চলে ও?
এ কারণেই কি এই পাড়াগাঁয়ের সাক্ষর-নিরক্ষর মানুষের মন সে ভরিয়ে দিতে পারল আনন্দের জোয়ারে?
মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর নিয়ামত জড়িয়ে ধরল দুখুকে। অভিনন্দন জানাল।
দুখু বলল, ‘এত খুশি হলে কেন তুমি?’
‘খুশি হব না? আমার সহপাঠী এত ভালো করল আর আমি খুশি হব না? তুমি কি ভেবেছ আমি হিংসুটে?’
দুখু উত্তর দিল, ‘কেরোসিন তেলের পিটপিটে আলো দেখে এত খুশি হলে চলবে?’
‘হ্যাজাক বাতির আলো দেখেছি চাঁদের আলোকেও ছাড়িয়ে যেতে। সে আলোকে আমি চিনেছি।’
‘সে তুমিই।’ জবাব দিল নিয়ামত।
পদ্যে গদ্য রচনা
বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। বাংলা প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে দুখুর বুকের মধ্যে জেগে উঠল দরিয়া।
পাঁচ নম্বর প্রশ্ন, রচনা লেখ। দেওয়া আছে পাঁচটি বিষয়। দুখু লিখতে বসে গেল বর্ষাকাল নিয়ে রচনা। তবে গদ্যে নয়, পদ্যে। পদ্যের পঙ্ক্তিতে ভরে ফেলল পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।
বাংলার পণ্ডিতমশাই গার্ড দিতে গিয়ে নজরুলের পাশে দাঁড়ালেন।
‘প্রশ্ন কেমন হয়েছে, দুখু?’
‘ভালো স্যার। সব কমন পড়েছে।’
‘বেশ ভালো। ভালোই প্রস্তুতি নিয়েছিস তা হলে?’
উত্তর দিল না দুখু। আপনমনে লিখতে লিখতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার অতিরিক্ত কাগজ লাগবে আমার।’
‘কী বলিস! এত কী লিখছিস যে খাতা লাগবে তোর!’
‘লিখছি, স্যার। যা জানি, সবই লিখছি উত্তরে।’
অতিরিক্ত খাতা দেওয়া হলো।
সবার আগে লেখা শেষ করে রিভিশন দিয়ে গার্ডের হাতে খাতা জমা দিয়ে আবার টেবিলে ফেরত এলো দুখু। কলম-পেনসিল গুছিয়ে বেরোনোর সময় পণ্ডিতমশাই ডাক দিলেন, ‘এই বাঁদর, এদিকে আয়!’
দুখু মাথা ঘুরিয়ে বোঝার চেষ্টা করল স্যার কাকে বললেন কথাটা।
না-বুঝে প্রশ্ন করল, ‘আমাকে কিছু বলছেন, স্যার?’
‘হ্যাঁ, তোকে ছাড়া আর কাকে বলব? এদিকে আয়, কী লিখেছিস এটা! রচনার বদলে পদ্য লিখে পাতার পর পাতা ভরিয়ে দিয়েছিস কেন?’
উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না দুখু। কান ধরে টেনে গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিলেন তিনি!
প্রতিবাদ করতে চাইল সে। বুক উঁচিয়ে দাঁড়াল শক্ত হয়ে।
সঙ্গে সঙ্গে বেতের বাড়ি এসে পড়ল দুখুর পিঠে।
বেত্রাঘাতের জ্বলুনি হুঁশ করে জাগিয়ে দিল ক্ষোভ। ক্ষোভের মধ্যে বারুদের মতো উড়ে এসে জুটল অপমানের বারুদ।
এক ঝটকায় পরীক্ষার খাতাটা সে ছিনিয়ে নিল পণ্ডিতমশাইয়ের হাত থেকে। পাশে হেডমাস্টারের কক্ষ। গটগট করে ঢুকে গেল সেই কক্ষে! এ মুহূর্তে অনুমতির প্রয়োজনই বোধ করল না দুখু।
‘কী ব্যাপার? অনুমতি না নিয়ে ঢুকলে কেন ভেতরে?’
হেডস্যারের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উত্তেজিত গলায় দুখু অভিযোগ করল, ‘পরীক্ষার হলে পণ্ডিতমশাই আমার খাতা দেখে পিটিয়েছেন আমাকে।’
মহিমচন্দ্র খাসনবিশ প্রধান শিক্ষক হয়েও চমকে উঠলেন। ঝটিতি উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার থেকে। এ ছেলে কখনো শ্রেণিকক্ষে দুষ্টমি করেনি, স্কুলে দস্যিপনারও কোনো রেকর্ড নেই, কোনো বদনাম নেই। জনপ্রিয় ছাত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তারপরও পরীক্ষার হলে পিটুনি খেল!
পিটুনি খেয়েছে ভালো কথা, হেডমাস্টারের কক্ষেও ঢুকে গেল অভিযোগ জানাতে, শ্রেণিশিক্ষকের বিরুদ্ধে?
এক পাল্লায় পণ্ডিতমশাইয়ের মর্যাদা, আরেক পাল্লায় উঠে গেল দুখুর জন্য স্নেহের টান। পাল্লা কাত হয়ে গেল দুখুর দিকে। নিজের বিস্ময় রুখে দিয়ে ঠান্ডা স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘নকল করেছিস? মার খেলি কেন?’
‘না স্যার, নকলের জন্য নয়। পদ্যে পদ্যে ‘বর্ষা’র রচনা লিখেছি বলেই এভাবে মারলেন আমাকে।’
‘পদ্যে রচনা লিখলি কেন?’
‘প্রশ্নে বলা আছে রচনা লেখার কথা। গদ্যে না পদ্যে লিখতে হবে, সেটা তো বলা নেই। তাই পদ্যে লিখেছি। এভাবে লিখতে আমি বেশি আনন্দ পাই।’
হেডমাস্টার বললেন, ‘দেখি তো তোর খাতা।’
বর্ষা রচনার ওপর চোখ বোলানোর সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ কপালে উঠে গেল। কোনো জবাব দিতে পারলেন না তিনি। তার কেবলই মনে হতে লাগল দরিরামপুর স্কুল প্রাঙ্গণে নেমে এসেছে আকাশের চাঁদ। এই চাঁদ, নিশ্চিত, যুগ থেকে যুগে আলোয় আলোয় ভরিয়ে রাখবে স্কুলটিকে।
ইতিমধ্যে পিয়নের কাছ থেকে পণ্ডিতমশাই শুনেছেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা। বেত হাতে তিনি বেরিয়ে এলেন পরীক্ষার হল থেকে। হেডস্যারের রুম থেকে বেরোতে থাকা দুখুর হাত খপ করে ধরে ফেললেন তিনি। আবার শুরু করলেন বেদম মার।
একটুও কাঁদল না দুখু। একটুও প্রতিবাদ করল না আর। নীরবে মার খেয়ে চলল। একসময় থামলেন পণ্ডিতমশাই। তারপর অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন দুখুর মুখের দিকে।
চোখে জল এলো দুখুর। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল, ‘কী করব আমি, স্যার? আমার ভেতর থেকে পদ্যের চরণ দাপিয়ে ওঠে। পদ্য লিখতেই আনন্দ আমার...।’
ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গেছে পণ্ডিতমশাইয়ের মাথা। নিভে গেছে তার ক্ষোভের আগুন।
দুখুর চোখের জল তার চোখ ভরিয়ে দিল অনুতাপের জলে। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন কেবল। কিছুই আর বলতে পারলেন না মুখ ফুটে।
প্রথম স্থান
সন্ধ্যায় নিয়ামত এসেছে দুখুর খোঁজে। দেখল কাচারি ঘরটা অন্ধকার। ভাবল হয়তো কোথাও আছে দুখু, এখনও ঘরে আলো জ্বালায়নি।
সময় পেরিয়ে যায়। দুখু নেই।
ঘরে আর লণ্ঠন জ্বলল না। আঁধারে ঢেকে রইল দুখুর কাচারি ঘর।
ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর আর কখনো আলোকিত হলো না, তার আকাশে ছড়াল না দুখু নামের আলো। দুখুরও জানা হলো না দরিরামপুর স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে সে প্রমোশন পেয়েছে ক্লাস এইটে।
সময়ের আলো/জেডআই