শহরের এক ছোট্ট পাড়ায় থাকত দশ বছরের ছেলে রিদয়। পড়াশোনায় সে মোটামুটি ভালো, তবে গাছপালা আর পাখির প্রতি তার ছিল অদ্ভুত টান। স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়া গাছটির নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, পাখিদের ডাক শোনা কিংবা ছোট্ট পুকুরটিতে শাপলা ফুটেছে কি না- এসব না দেখে সে বাড়ি ফিরত না।
একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে রিদয়ের চোখে পড়ল, পাড়ার সেই ছোট্ট পুকুরটির চারপাশে কত ময়লা! পলিথিনের ব্যাগ, পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট- সবকিছু পড়ে আছে। পানিতে ভাসছে প্লাস্টিকের কাপ আর নানা রকম আবর্জনা। কয়েকটি হাঁস পুকুরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের দেখে রিদয়ের মন খারাপ হয়ে গেল।
স্কুলে সেদিন পরিবেশবিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক বললেন, ‘তোমরা জানো, পরিবেশ শুধু গাছপালা নয়; মাটি, পানি, বাতাস, প্রাণী, পাখি- সব মিলেই আমাদের পরিবেশ। আমরা যদি পরিবেশকে নষ্ট করি, একসময় তার ক্ষতি আমাদেরই ভোগ করতে হবে।’
রিদয় হাত তুলে বলল, ‘স্যার, আমরা কি আমাদের পাড়ার পরিবেশটা একটু ভালো করতে পারি?’
শিক্ষক মুচকি হেসে বললেন, ‘অবশ্যই পারো। তবে শুধু নিজেরা পরিষ্কার করলেই হবে না। অন্যদেরও বোঝাতে হবে।’
পরদিন রিদয় তার তিন বন্ধু- মাহি, তন্ময় আর নীলাকে নিয়ে একটি দল বানাল। দলের নাম দিল ‘সবুজ বন্ধু’। তারা ঠিক করল, প্রতি শুক্রবার তারা পাড়ার একটি জায়গা পরিষ্কার করবে।
প্রথম শুক্রবার তারা পুকুরপাড়ে গেল। হাতে গ্লাভস, বস্তা আর ঝাড়ু। ময়লা কুড়িয়ে আলাদা আলাদা বস্তায় ভরতে লাগল। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে তারা অবাক হয়ে দেখল, অনেকেই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে তাদের দেখে হাসছে।
একজন বলল, ‘এত ময়লা তোমরা পরিষ্কার করে কী করবে? আবার তো মানুষ ফেলবে!’
রিদয় কিছু বলল না। সে শুধু হাসল এবং কাজ চালিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধ লোক এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি পারো, আমিও একটু সাহায্য করি।’ তিনি হাতে ঝাড়ু তুলে নিলেন।
তারপর আরও দুজন এলেন। কেউ ময়লা তুলল, কেউ গাছের শুকনো ডাল সরাল। দুপুরের মধ্যেই পুকুরপাড় অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
কাজ শেষে রিদয় একটি ছোট্ট সাইনবোর্ড বানিয়ে লাগিয়ে দিল- ‘এই পুকুর আমাদের, পরিষ্কার রাখার দায়িত্বও আমাদের।’
তবে শুধু পরিষ্কার করলেই তো হবে না। তারা পাড়ার মানুষকে বোঝাতে শুরু করল- প্লাস্টিকের বোতল বা পলিথিন যেখানে-সেখানে না ফেলতে, কল অযথা খোলা না রাখতে, প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ না জ্বালাতে এবং বেশি বেশি গাছ লাগাতে।
কয়েক সপ্তাহ পর পাড়ার চেহারা বদলে গেল। পুকুরে আবার হাঁস নামল। পানির ওপর শাপলা ফুটল। রাস্তার পাশে ছোট ছোট গাছ লাগানো হলো। দোকানিরা পলিথিনের বদলে কাগজের ব্যাগ ব্যবহার শুরু করলেন।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় রিদয় দেখল, সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে কয়েকটি পাখি বসে আছে। গাছের নিচে কোনো ময়লা নেই। পাশে দাঁড়িয়ে মাহি বলল, ‘দেখেছিস? আমরা সত্যিই পারলাম!’
রিদয় মৃদু হেসে বলল, ‘আমরা একা পারিনি। সবাই মিলে পেরেছি।’
তন্ময় বলল, ‘তা হলে আমাদের কাজ শেষ?’
রিদয় মাথা নাড়ল। না। পরিবেশকে ভালো রাখা এক দিনের কাজ নয়। এটা প্রতিদিনের দায়িত্ব।’
সেদিন চার বন্ধু গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একটি প্রতিজ্ঞা করল- তারা নিজেরা পরিবেশ নষ্ট করবে না, অন্যকেও করতে দেবে না। আর সুযোগ পেলেই সবাইকে বোঝাবে, পৃথিবীটা শুধু আমাদের জন্য নয়; পাখি, প্রাণী, গাছ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও।
দূরে তখন বিকালের আকাশে সূর্য ডুবছিল। কৃষ্ণচূড়ার পাতার ফাঁক দিয়ে শেষ আলো এসে পড়েছিল চার বন্ধুর মুখে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতিও যেন তাদের ছোট্ট প্রতিজ্ঞার জন্য হাসছে।
সময়ের আলো/মহু