একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, চারদিকে তখন অস্থির এক পৃথিবী। যুদ্ধের ক্ষত শুকায়নি, ক্ষুধার দীর্ঘশ্বাস থামেনি, শোষণের অন্ধকার আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিলেমিশে আছে বাতাসে। শিশুটি কিছুই জানে না তখনো। ইতিহাস কী, রাজনীতি কী, মানুষ কতটা নির্মম হতে পারে, কিছুই তার জানা নেই। ভাষাও শেখেনি। তবু জন্মের মুহূর্তেই সে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে যেন নিজের অধিকার ঘোষণা করে বসে!
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই নবজাতকের কান্নার ভেতরই যেন শুনতে পেয়েছিলেন ভবিষ্যতের ডাক। তাই লিখলেন, ‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হ’লো আজ রাত্রে / তার মুখে খবর পেলুম: / সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক / নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার / জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।’
বাংলা কবিতায় এমন মুহূর্ত সচরাচর মেলে না, যেখানে একটি নবজাতক একই সঙ্গে ভবিষ্যতের প্রতীক, ইতিহাসের উত্তরাধিকারী, আবার মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্নেরও প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। সুকান্তের জন্মশতবর্ষে পেছনে ফিরে তাই কেবল একজন অকালপ্রয়াত কবিকে স্মরণ করলেই চলে না, নিজেদের সময়টাকেও নতুন চোখে দেখতে হয়। কারণ যে পৃথিবীকে তিনি একটি শিশুর জন্য বাসযোগ্য করে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন, সে পৃথিবী আজও পুরোপুরি বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন থেমে গিয়েছিল মাত্র একুশ বছর বয়সে, ১৯৪৭ সালের ১৩ মে। জীবনের পরিধি ছোট ছিল বটে, কিন্তু স্বপ্নের পরিধি ছিল অসীম। তিনি এমন এক সময়ের জন্মেছেন, যখন উপমহাদেশের আকাশে একদিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর ঔপনিবেশিক শোষণের অন্ধকার ঘন হয়ে উঠছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, মানুষের অনাহার, কৃষক ও শ্রমিকের বঞ্চনা, ফ্যাসিবাদের উত্থান, রাজনৈতিক সংঘাত- এসবই ছিল তার কৈশোরের নির্মম বাস্তবতা। সেই বাস্তবতা তাকে নিছক সৌন্দর্যের কবি হয়ে থাকতে দেয়নি। কবিতা তার কাছে হয়ে উঠেছিল মানুষের ক্ষুধা, শ্রম, অপমান, প্রতিবাদ আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের ভাষা।
তাই ‘প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা’ বলে যখন তিনি ঘোষণা করেন ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’, তখন সেটা নেহাত কাব্যিক উচ্চারণ ছিল না। ছিল একটা সময়ের নির্মম সত্যের বিরুদ্ধে সোজা দাঁড়িয়ে যাওয়া।
সুকান্তের কবিতায় ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ, শ্রমজীবীর জীবন, বঞ্চিতের দীর্ঘশ্বাস, শোষিতের ক্ষোভ বারবার ফিরে এসেছে। তার কাছে কবিতা জীবনের বাইরে আলাদা কোনো সৌন্দর্যের জগৎ নয়, কবিতা ছিল জীবনেরই অংশ, মানুষের লড়াইয়ের অংশ। এই কারণেই তার কাব্যে চাঁদও কখনো নিছক রোমান্টিক সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে থাকেনি, ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে সেই চাঁদ হয়ে উঠেছে ‘ঝলসানো রুটি’।
সুকান্তকে আমরা প্রায়ই ‘কিশোর কবি’ বলে পরিচয় করাই। কিন্তু এই অভিধা কখনো কখনো তার কবিসত্তার ব্যাপ্তিটাকে ছোট করে ফেলে। কিশোর বয়সেই লিখেছেন ঠিক, কিন্তু তার কবিতার অভিজ্ঞতা কেবল কৈশোরের আবেগে আটকে ছিল না। তার কবিতায় আছে ইতিহাসের বোধ, শোষণ ও বৈষম্যের উপলব্ধি, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রত্যয়, আর একটা ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবীর স্বপ্ন।
তিনি বুঝেছিলেন, কবিতা তখনই সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, যখন সে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। সৌন্দর্য মানে তার কাছে শুধু ফুল, চাঁদ কিংবা প্রেমের রোমান্টিকতা নয়, ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে এক টুকরো রুটিও সৌন্দর্যের এক মৌলিক প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গাতেই সুকান্তের সঙ্গে আজকের পৃথিবীর এক আশ্চর্য সম্পর্ক তৈরি হয়। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলেছে, মানুষের জীবনযাপনও বদলেছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের সামনে প্রশ্নগুলো কি সত্যিই বদলে গেছে?
উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে তরুণেরা যখন রাজপথে নামে, রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন সুকান্তের কবিতার সেই নবজাতক শিশুটিকে যেন আবার দেখা যায়। যে শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই কবি শুনেছিলেন অধিকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা।
আজকের জেন-জি প্রজন্মও যেন সুকান্তের সেই একই প্রশ্ন নতুন ভাষায় করছে। এই পৃথিবী কি তাদের জন্য? তাদের ভবিষ্যৎ কি নিরাপদ? তারা কি আদৌ এমন একটা সমাজ পাবে, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে, যেখানে পরিচয় বা রাজনৈতিক মতের কারণে কারও স্বপ্ন থেমে যাবে না? এমন রাষ্ট্র কি তারা পাবে, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা ক্ষমতার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে না? এমন ভবিষ্যৎ, যেখানে তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তাদের মতামতকে বাদ দিয়ে নেওয়া হবে না?
এসব প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে বিভাজন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য আর সামাজিক অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত। একদিকে প্রযুক্তি মানুষের হাতে অভূতপূর্ব সম্ভাবনা এনে দিয়েছে, অন্যদিকে সেই একই প্রযুক্তি বিভ্রান্তি, মেরুকরণ আর ঘৃণার বিস্তারও ঘটাতে পারে।
আজ একটা শিশু জন্ম নেওয়ার মুহূর্তেই এমন এক পৃথিবীতে ঢুকছে, যেখানে তার সামনে ভবিষ্যতের অসংখ্য দরজা খোলা। কিন্তু একই সঙ্গে অপেক্ষা করছে জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানসিক বিচ্ছিন্নতার মতো কঠিন সব বাস্তবতা। সুকান্তের ভাষায় বলতে গেলে, পৃথিবীকে এখনো ‘জঞ্জাল’ থেকে পরিষ্কার করার কাজ শেষ হয়নি।
এই কারণেই ‘ছাড়পত্র’ আজ শুধু একটা কবিতা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটা নৈতিক দায়বদ্ধতার দলিলও বটে। নবজাতককে দেখে সুকান্ত নিজের জন্য কোনো পুরস্কার চাননি, নিজের সময়কে মহিমান্বিতও করেননি।
বরং বলেছেন, ‘চ’লে যাবে, তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ / প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল, / এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি / নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ এই কয়েকটি পঙ্ক্তির ভেতর যেন তার সমগ্র মানবতাবাদ জমাট বেঁধে আছে।
তিনি জানতেন, তার প্রজন্ম চিরকাল থাকবে না। নিজের জীবনের সামনে কতটুকু সময় বাকি, তা-ও জানা ছিল না তার। তবু ভবিষ্যতের শিশুর জন্য একটা ভাল পৃথিবী রেখে যাওয়ার দায় থেকে তিনি সরে দাঁড়াননি।
আজকের তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের সঙ্গে সুকান্তের এই অঙ্গীকারের মিলটা ঠিক এখানেই। জেন-জি যখন রাজনীতির পুরনো ভাষা প্রত্যাখ্যান করে নতুন প্রশ্ন তোলে, তখন তাদের আন্দোলনকে নিছক ক্ষমতার পালাবদলের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর গভীরে থাকে মর্যাদা, ন্যায়, অংশগ্রহণ, আর ভবিষ্যতের অধিকার। একটা প্রজন্ম যখন বলে, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তারও আছে, তখন সেটা সুকান্তের নবজাতকের মুষ্টিবদ্ধ হাতেরই আধুনিক প্রতিধ্বনি। সেই হাত কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রতীক নয়। সেটা অধিকারবোধের প্রতীক, নিজের সময় আর ভবিষ্যৎকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
তবে সুকান্তের দ্রোহ অন্ধ প্রতিহিংসার দ্রোহ ছিল না। তার কবিতায় ক্ষোভ আছে, প্রতিশোধের ভাষাও আছে, কিন্তু তার আড়ালে ছিল মানুষের প্রতি গভীর মমতা। ‘প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা, / ভেঙেছিস ঘর বাড়ি, / সে কথা কি আমি জীবনে মরণে / কখনো ভুলতে পারি?’ এই উচ্চারণ ব্যক্তিগত বেদনা থেকে শুরু হয়ে বৃহত্তর সামাজিক অন্যায়ের দিকে গিয়ে পৌঁছায়।
এরপর তিনি বলেন, ‘আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই / স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের / চিতা আমি তুলবাই।’ এই ভাষা সময়ের ক্ষত থেকেই উঠে এসেছে। তাই একে শুধু প্রতিহিংসার ভাষা হিসেবে পড়লে সুকান্তের কবিতার ভেতরকার মানবিক সুরটাই আসলে ধরা পড়ে না।
তার দ্রোহের লক্ষ্য ছিল এমন একটা সমাজ, যেখানে মানুষের ঘর ভাঙবে না, ক্ষুধায় কেউ মরবে না, শ্রমের মূল্য অস্বীকার করা হবে না, ক্ষমতার কাছে মানুষের মর্যাদা হেরে যাবে না। তার কবিতার ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল মানুষের প্রতি মানুষের অন্যায়। তাই এই দ্রোহ শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের জন্য নয়, নির্মাণের জন্য। পুরনো অন্যায় ভেঙে নতুন ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবী গড়ে তোলাই ছিল তার স্বপ্ন।
সুকান্তের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, তিনি ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারতেন। নিজের সময়ের অন্ধকার শুধু দেখেননি, অন্ধকারের ওপারের আলোটাও দেখেছিলেন। নতুন শিশু মানে তার কাছে নতুন ইতিহাসের সম্ভাবনা। তাই ‘ছাড়পত্র’র শেষে নিজের মৃত্যুকেও ভয় পান না তিনি। বলেন, ‘অবশেষে সব কাজ সেরে / আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে / করে যাবো আশীর্বাদ, / তারপর হব ইতিহাস।’
কী আশ্চর্য আত্মবোধ! মাত্র একুশ বছরের এক তরুণ কবি নিজের ভবিষ্যৎকে ইতিহাসের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত, যদি তার জীবন আর রক্ত ভবিষ্যতের মানুষের কাজে লাগে।
আজ যখন আমরা নবজাতক শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি, প্রশ্নটা আরও গভীর হয়ে ওঠে। আমরা তাকে কী পৃথিবী দিয়ে যাচ্ছি? এমন এক পৃথিবী, যেখানে সে নিরাপদে বড় হতে পারবে, নাকি এমন এক সমাজ, যেখানে ছোটবেলা থেকেই তাকে বিভাজন, ঘৃণা আর প্রতিযোগিতার কঠিন পাঠ শিখতে হবে? এমন রাষ্ট্র দিয়ে যাব কি, যেখানে তার কণ্ঠের দাম আছে? এমন শিক্ষা, যা শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করবে তাকে, নাকি মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দেবে? এমন প্রযুক্তি, যা জীবন সহজ করবে, নাকি এমন এক ভার্চুয়াল জগত, যেখানে সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাবে?
সুকান্তের সময়ের শিশুটি জন্মেছিল যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষের পৃথিবীতে। আজকের শিশু জন্মাচ্ছে অন্য ধরনের সংকটের মধ্যে। কিন্তু প্রশ্নটা একই থেকে গেছে। পৃথিবী কি তার জন্য প্রস্তুত? নাকি পুরনো অন্যায়, পুরনো বৈষম্য, পুরনো ক্ষমতার কাঠামো আর পুরনো ঘৃণাগুলো তার হাতে তুলে দিয়ে আমরা বলছি, এবার তুমি সামলাও?
সুকান্তের উত্তরটা স্পষ্ট ছিল। নতুন শিশুকে জায়গা করে দিতে হলে পুরনো পৃথিবীর জঞ্জাল সরাতে হবে। সেই জঞ্জাল শুধু ধ্বংসস্তূপ নয়। অন্যায়, বৈষম্য, ক্ষুধা, শোষণ, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, রাজনৈতিক দমন, দুর্নীতি, মিথ্যা, আর মানুষের প্রতি মানুষের অবজ্ঞাও সেই জঞ্জালেরই অংশ। নতুন পৃথিবী শুধু নতুন প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না, তৈরি হয় মানুষের বিবেক, ন্যায়বোধ আর দায়িত্ববোধ দিয়ে।
সুকান্ত আজ বেঁচে থাকলে হয়তো তার কবিতায় আমাদের সময়ের ভাষাটাই বদলে যেত। স্মার্টফোনের আলোয় জেগে থাকা তরুণের চোখে হয়তো তিনি নতুন পৃথিবীর কুয়াশা দেখতেন। রাজপথে দাঁড়ানো তরুণের মুষ্টিবদ্ধ হাতে হয়তো খুঁজে পেতেন সেই নবজাতকের হাতেরই প্রতিচ্ছবি। হয়তো দেখতেন, প্রযুক্তির যুগেও মানুষ একই রকম ন্যায়, মর্যাদা, স্বাধীনতা আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা খুঁজছে। কিন্তু তার মূল জিজ্ঞাসাটা বদলাত না, মানুষ কি তার পৃথিবীকে আরও মানবিক করে তুলতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। কারণ সুকান্ত শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত উত্তর রেখে যাননি, রেখে গেছেন একটা অঙ্গীকার। নিজের প্রজন্মকে চিরস্থায়ী ভাবেননি তিনি, জানতেন একদিন নতুন শিশুরা আসবে, পুরনো মানুষ চলে যাবে। সেই চলে যাওয়ার আগে পৃথিবীটাকে একটু বাসযোগ্য করে যাওয়াটাই মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
সুকান্তের জন্মদিন তাই শুধু একজন কবির জন্মদিন নয়, এটা ভবিষ্যতের কাছে নিজেদের দায় স্বীকার করার দিন। আজ যে শিশু জন্ম নিল, সে কোনো দলের নয়, কোনো মতাদর্শের নয়, কোনো বিভাজনের নয়। সে ভবিষ্যতের। তার জন্য আমাদের রেখে যেতে হবে এমন এক পৃথিবী, যেখানে তার প্রথম কান্না শুধু জন্মের ঘোষণা হবে, প্রতিবাদের নয়। যেখানে তার চোখে ভবিষ্যৎ মানে অনিশ্চয়তা নয়, সম্ভাবনা।
সুকান্ত মাত্র একুশ বছরেই ইতিহাস হয়ে গেছেন। কিন্তু তার ‘ছাড়পত্র’ আমাদের সামনে রেখে গেছে আরও বড় একটা প্রশ্ন। আমরা যারা আজ বেঁচে আছি, শিশুর জন্য উপযোগী সেই পৃথিবী তৈরি করার দায়িত্ব কি আমরা পালন করছি? নাকি শুধু নিজেদের সময়টুকু ভোগ করে তার হাতে তুলে দিচ্ছি একটা ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত পৃথিবী?
সুকান্তের অগ্নিকণ্ঠ যেন আজও সেই উত্তর দাবি করে। ‘এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি’, এই অঙ্গীকারই তার কবিতার সবচেয়ে উজ্জ্বল উত্তরাধিকার। জন্মশতবর্ষে তাকে স্মরণ করার সবচেয়ে সত্যিকারের উপায় শুধু তার কবিতা আবৃত্তি করা নয়, বরং সেই অঙ্গীকারকে নিজের জীবনের দায়িত্ব হিসেবে তুলে নেওয়া। কারণ নতুন শিশু প্রতিদিনই জন্ম নিচ্ছে, আর তার সঙ্গে জন্ম নিচ্ছে পৃথিবীটাকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগও।