কিছু মানুষ সময়ের সঙ্গে জন্মান, আর কিছু মানুষ জন্মান সময়ের বিরুদ্ধে। হুমায়ুন আজাদ ছিলেন দ্বিতীয় দলের মানুষ। যে সমাজ তাকে ঘিরে রেখেছিল, তিনি তার ভেতরেই দাঁড়িয়ে সমাজকে প্রশ্ন করেছিলেন। যে বিশ্বাসগুলোকে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্পর্শ না করেই সত্য বলে মেনে নিয়েছিল, তিনি সেগুলোর গায়ে হাত রেখেছিলেন, নেড়েচেড়ে দেখেছিলেন, প্রয়োজন হলে ভেঙেও দিতে চেয়েছিলেন। তাই তার জীবন যেমন ছিল আলোয় ভরা, তেমনি ছিল অন্ধকারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই।
১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল বিক্রমপুরের কামারগাঁয়ে জন্ম নেওয়া হুমায়ুন আজাদ বাংলা সাহিত্যে এসেছিলেন এক অস্থির সময়ের সন্তান হয়ে। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা, ভাষাবিজ্ঞান, সমালোচনা কিংবা কিশোরসাহিত্য, যে ক্ষেত্রেই তিনি লিখেছেন, নিজের আলাদা স্বর তৈরি করেছেন। তার শব্দ ছিল কখনো ধারালো ছুরির মতো, কখনো গভীর রাতের নিঃসঙ্গতার মতো, আবার কখনো এমন এক বাতাসের মতো, যা বন্ধ জানালার ঘরে ঢুকে হঠাৎ পর্দা উড়িয়ে দেয়।
তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে।’ এর মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে তার অনেক দিনের জীবন। তিনি এমন এক পৃথিবীতে নিজের মতো করে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষকে দাঁড়ানোর ভঙ্গিও শেখানো হয়, কথা বলার ভাষাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, স্বপ্ন দেখার সীমাও ঠিক করে দেয় অন্যেরা। তিনি চেয়েছিলেন নিজের ভাষায় কথা বলতে, নিজের চোখে পৃথিবী দেখতে, নিজের মতো করে ভালোবাসতে। কিন্তু তার চারপাশের পৃথিবী তখনও সেই স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
তাই তার কবিতায় বারবার ফিরে আসে না-পাওয়ার বেদনা। নিজের সময় না আসার বেদনা। নিজের নদী না পাওয়ার বেদনা। নিজের বৃক্ষের অঙ্কুর না ফোটার বেদনা।
তিনি যেন এমন একজন পথিক, যিনি জানতেন তার গন্তব্য কোথাও আছে, কিন্তু সেই গন্তব্যের দিকে যাওয়ার রাস্তা তখনও তৈরি হয়নি।
হুমায়ুন আজাদের প্রেমও তাই ছিল অন্যরকম। ‘তোমার দিকে আসছি’ কবিতায় প্রিয় মানুষের দিকে এগিয়ে যাওয়া কোনো সরল যাত্রা নয়। সেখানে একেকটি জন্ম শেষ হয়ে যায়, পথ শেষ হয় না। কখনো পায়ের চিহ্নের কাছে থেমে যায় জীবন, কখনো একটি দীর্ঘশ্বাসের ভেতর কেটে যায় একটি জন্ম, কখনো গোলাপের পাপড়ি হয়ে বাতাসে ঝরে পড়েন তিনি। ভালোবাসাকে তিনি পেয়েছেন অনেকটা স্বপ্নের মতো, ছুঁতে চেয়েছেন কিন্তু সম্পূর্ণভাবে ধরতে পারেননি। এই না-পাওয়ার মধ্যেও ছিল এক ধরনের সৌন্দর্য।
হুমায়ুন আজাদ শুধু প্রেমের কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রশ্নের কবি। তার কলম পুরুষতন্ত্রকে প্রশ্ন করেছে, ধর্মীয় মৌলবাদকে প্রশ্ন করেছে, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছে, এমনকি বাঙালির আত্মপ্রবঞ্চনাকেও রেহাই দেয়নি। তার ব্যঙ্গ কখনো তীব্র, কখনো নির্মম। কিন্তু সেই নির্মমতার ভেতরেও ছিল সমাজকে ভালো করার এক গভীর আকাঙ্ক্ষা।
‘পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম মা’ লিখে তিনি শুধু একটি বাক্য লেখেননি, বহু শতাব্দীর সামাজিক কাঠামোর দিকে আঙুল তুলেছিলেন। ‘নারী’ গ্রন্থে তিনি নারীর জীবন, অধিকার ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে যে দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, তা তৎকালীন সমাজে প্রবল বিতর্ক তৈরি করে। বইটি নিষিদ্ধও হয়েছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা কোনোদিন চিন্তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বইয়ের পাতা বন্ধ করা যায়, প্রশ্নের দরজা বন্ধ করা যায় না।
হুমায়ুন আজাদের লেখার শক্তি ছিল এখানেই; তিনি পাঠককে সবসময় শান্তি দিতে চাননি। বরং কখনো কখনো পাঠকের ভেতরের শান্তিটুকু নষ্ট করে দিতে চেয়েছেন, যাতে সেই অস্বস্তি থেকে জন্ম নেয় নতুন কোনো প্রশ্ন।
তিনি লিখেছিলেন, ‘উন্নতি হচ্ছে ওপরের দিকে পতন।’ এই একটি বাক্যেই যেন আমাদের সভ্যতার অনেক মুখ দেখা যায়। আমরা যাকে সাফল্য বলি, তার ভেতরে কত পতন লুকিয়ে থাকে, যাকে গৌরব বলি তার নিচে কত নতজানুতা জমে থাকে, তা তিনি দেখতে পেতেন।
১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া এই লেখক তার জীবদ্দশায় বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তার ‘নারী’, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’সহ বিভিন্ন গ্রন্থ পাঠক ও সমাজে আলোড়ন তুলেছে। ভাষাবিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চায় তার অবদানের স্বীকৃতি এসেছে মরণোত্তর একুশে পদকের মাধ্যমে, যা তিনি পেয়েছেন ২০১২ সালে।
২০০৪ সালের ১১ আগস্ট জার্মানিতে থেমে যায় তার জীবনের পথ। একজন মানুষ চলে গেলেন, কিন্তু তার উচ্চারণ থামল না। কারণ কিছু মৃত্যু কেবল শরীরের মৃত্যু। চিন্তার মৃত্যু নয়।
হুমায়ুন আজাদ হয়তো সত্যিই ভুল সময়ে জন্মেছিলেন। তার সময় হয়তো তখনও আসেনি। কিন্তু সময় কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। বছর পেরোয়, প্রজন্ম বদলায়, পুরোনো বিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরে। তখন কোনো একদিন পুরোনো বইয়ের পাতা খুলে পাঠক আবিষ্কার করে, যে মানুষটিকে একসময় অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল, তিনি আসলে অনেক দূরের ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন।
তাই আজও হুমায়ুন আজাদকে পড়া মানে শুধু একজন মৃত লেখককে স্মরণ করা নয়। নিজের সময়কে আয়নার সামনে দাঁড় করানো। হয়তো তার সবচেয়ে বড় পরিচয় এই, তিনি অন্যদের সময়ে বেঁচেছিলেন। কিন্তু তার লেখা এখনও সময়ের অপেক্ষায় আছে।
সময়ের আলো/টিকে