অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ ধ্রুপদি পিয়ানোবাদক, সাহিত্য সমালোচক, সংগীতজ্ঞ, তাত্ত্বিক ইত্যাদি নানাবিধ পরিচয়ের পাশাপাশি সচেতন বিশ্ববাসীর কাছে তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিচয়— তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝে সর্বাপেক্ষা উচ্চকণ্ঠ। ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কয়েকজন উপনিবেশবিরোধী চিন্তকদের মাঝে সাঈদ ছিলেন অন্যতম। তিনি কলম ধরেছিলেন উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এবং উপনিবেশ স্থাপনকারী রাষ্ট্রগুলোর সমালোচনায় ছিলেন মুখর। অথচ একজন পাঠক হিসেবে তিনি যেসব বই পড়েছেন, তার সিংহভাগই ছিল উপনিবেশ স্থাপনকারীদের লেখা।
‘ওরিয়েন্টালিজম’ সাঈদের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী কাজ। সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় সমালোচকের চিন্তার উদ্রেককারী এই বইটি মূলত সাঈদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ অবস্থানের মিশেল। এ বইয়ে সাঈদ ইতিহাসের একটি রূপরেখা বিনির্মাণের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। বইটিতে উঠে এসেছে যে, পৃথিবীর ইতিহাসে সাংস্কৃতিক ক্ষমতার সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। মূলত এই দুয়ের যৌথ প্রয়াসেই শাসনের কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভবপর হয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলো প্রাচ্যের অধিবাসীদের দেখে অত্যন্ত সংবেদনশীল, অলস, অত্যাচারী, নিপীড়ক হিসেবে। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি সত্যিই কতটা বাস্তবসম্মত, সেটি তর্কসাপেক্ষ।
সাঈদের দৃষ্টিতে ছড়ি ঘোরানোর কাজটি মূলত পাশ্চাত্যই করে এসেছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্কটি মূলত ক্ষমতার, যা কি না শাসন, শোষণ এবং আধিপত্য বিস্তারের এক অত্যন্ত জটিল ও সূক্ষ্ম শৃঙ্খলে জড়িয়ে আছে। পশ্চিমা দেশগুলো প্রকারান্তরে পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে মোড়লের ন্যায় আচরণ করছে। সেটি উপনিবেশের ওপর উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশগুলোর আধিপত্যকে জোরদার করে। ফুকো, ফ্যানন, ক্লডে প্রভৃতি ফরাসি চিন্তকের দ্বারা অনুপ্রাণিত সাঈদ নিজে ছিলেন সেই বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম, যারা যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গনে দৃঢ়তার সঙ্গে উপনিবেশবিরোধী চিন্তা-ভাবনার স্ফুরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ অধিকারবঞ্চিত ছিলেন না, অথচ তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাতারেই পড়েন। তিনি সম্পদশালী ছিলেন, তবে ক্ষমতাহীন ছিলেন। জীবনের সবটুকু দ্বন্দ্বমুখরতার এত তীব্র, স্পষ্ট উপস্থিতিই তাকে মানুষ হিসেবে অদ্ভুত এক সংবেদনশীলতায় ভাসিয়েছে। ২০০৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা