শীর্ষেন্দুর স্মৃতিতে ময়মনসিংহ, হৃদয়জুড়ে বাংলাদেশ

সময়ের আলো ডেস্ক

সাহিত্য

‘বাংলাদেশে এলে মনে হয় নিজের বাড়িতেই এসেছি’- কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ঘুরতে এসে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয়

2026-11-02T18:00:30+00:00
2026-11-02T18:02:04+00:00
 
  সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬,
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
শীর্ষেন্দুর স্মৃতিতে ময়মনসিংহ, হৃদয়জুড়ে বাংলাদেশ
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:০০ পিএম  আপডেট: ০২.১১.২০২৬ ৬:০২ পিএম
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। গ্রাফিক : সময়ের আলো
‘বাংলাদেশে এলে মনে হয় নিজের বাড়িতেই এসেছি’- কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ঘুরতে এসে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তিনি পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক হলেও তার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তার শৈশব কেটেছে বাংলাদেশে। তার স্মৃতিতে রয়েছে বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ) ও ময়মনসিংহের অনেক বর্ণিল স্মৃতি।

১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের এই ক্ষমতাধর লেখক। তার দাদাবাড়ি বিক্রমপুর জেলার টঙ্গিবাড়ি থানার অধীন বাইনখাড়া গ্রামে। বিক্রমপুর বানভাসি অঞ্চল ছিল বলে সেখানে চাষাবাদের ওপর মানুষের নির্ভরতা কম ছিল। তাই তখন সেখানকার মানুষেরা আয় রোজগারের খোঁজে অনেকেই অন্যত্র চলে যেত। শীর্ষেন্দুর দাদুও তেমনই চলে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহে। মুক্তাগাছার জমিদার বীরভদ্রবাবুকে একসময় প্রাইভেট পড়াতেন তার দাদু। সেই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ময়মনসিংহ শহরের অভিজাত এলাকায় তাকে অনেকটা জমি উপহার দেন সেই জমিদার। সেই থেকে শুরু হয় তাদের ময়মনসিংহে বসবাস। তারা সেখানে গড়ে তোলেন বসতবাড়ি।

শীর্ষেন্দুর ভাষায়, ‘বাড়ি বলতে একটা বড়সড় উঠোন ঘিরে চারটে টিনের ঘর। মাটির মেঝে। গোটা বাড়িটা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বাইরের দিকে অনেকটা ফাঁকা জমি ও মাঠ, সেখানে দাদুর কাছারিঘর। বাকি জায়গাটা ছিল রাজ্যের ছেলেপুলেদের খেলার জায়গা। বাড়ির পেছনে ছিল একটা পুষ্করিণী। উঠানের এক কোণে ছিল পাতকুয়া, আর বাইরের মাঠের ধারে একটা টিউবওয়েল, তার পাশে গোয়ালঘর।’


ময়মনসিংহের বুক চিড়ে বয়ে গেছে অনিন্দ্য সুন্দর এক নদ। নাম তার ‘ব্রহ্মপুত্র’। শীর্ষেন্দু ব্রহ্মপুত্রকে খুব ভালোবাসতেন। তার শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই নদকে ঘিরে। শীর্ষেন্দু আবেগাপ্লুত হয়ে লিখেছিলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র- যে-নদের কাছে আমার অপরিসীম ঋণ। বেশ চওড়া নদ, বিপুল জলের ঢল নিয়ে নিশিদিন বয়ে যেত। পাট, মুলিবাঁশ আর কত কী নিয়ে অগুনতি নৌকোর চলাচল। আর নদের ধারে গেলেই পাট পচানোর কটু গন্ধ আসত নাকে। ও-পাড় ছিল শম্ভুগঞ্জ। সে এক রহস্যময় জায়গা। সন্ধেবেলা দেখা যেত আলেয়ার আলো। লোকে বলত, আলেয়াভূত। সেই নদের সঙ্গে আমার আশৈশব সখাভাব। কত জায়গা ছুঁয়ে আসত নদের বিবাগী জল। উদাস স্রোত কোথা থেকে এসে কোন নিরুদ্দেশে চলে যায় কে জানে। সাঁতার শেখার পর ওই ব্রহ্মপুত্র ছিল আমার সবান্ধব জলক্রীড়ার তীর্থক্ষেত্র। দিনে ঘণ্টাটাক বা তার বেশি দাপদাপি না করলে শান্তি ছিল না। সে শুধু অবগাহন তো নয়, যেন মিশে যাওয়া। আজও সেই জলের পুণ্যস্পর্শ আমার সর্বাঙ্গে লেগে আছে।’

ময়মনসিংহকে তার কাছে রূপকথা মনে হতো ছেলেবেলায়। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে তখন ময়মনসিংহের মতো এমন রূপকথার রাজ্য আর কোথাও নেই। মেঘমুক্ত দিনে পুবদিকে তাকালে খুব আবছা একটা পাহাড় দেখা যেত। সেটা অনেক দূরে। শুনেছিলাম, সেটা নাকি গারো পাহাড়। ব্রহ্মপুত্রের ওপারে ছিল বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, শরৎকালে জায়গাটা কাশফুলে ভরে যেত। আর শীতকালে ব্রহ্মপুত্রে বড়-বড় চর পড়ত, গজাত নানা ঘাসপাতা।’

শীর্ষেন্দুর শৈশবে ময়মনসিংহ শহরে মোটরগাড়ি চলত না বললেই চলে। কখনো কদাচিৎ গোলোকপুর জমিদারবাড়ির একটা হুডওয়ালা মোটরগাড়ি যেত ও আসত। শব্দটা পেলেই তিনি দলবল সমেত দৌড়ে গিয়ে মোটরগাড়ি দেখে আসতেন। ময়মনসিংহে তখন যানবাহন বলতে দুটো জিনিসই ছিল প্রধান, সাইকেল ও ঘোড়ার গাড়ি। লেখকের ভাষায়, অনেকটা বড় পালকির মতো দেখতে গাড়িটা টেনে নিয়ে যেত দুটো করে টাট্টু ঘোড়া। সেই সব ঘোড়া ছিল রুগ্ন ও দুর্বল, কোচোয়ানের চাবুক আর গালাগাল খেয়ে তারা যথাসাধ্য ছুটত বটে, কিন্তু গতি ছিল অতীব মন্থর। তবে, জমিদারদের বেশ কয়েকটা করে হাতি থাকত। মাহুতরা হাতিকে স্নান করাতে ব্রহ্মপুত্রে নিয়ে এলে আমরাও সেখানে জুটে যেতাম। মাহুতদের কাকুতি-মিনতি করে কতবার যে হাতির পিঠে উঠে ঘুরেছি, তার হিসেব নেই। হাওদা ছাড়া হাতির পিঠে ওঠা অতিশয় বিপজ্জনক। কারণ, হাতির চওড়া পিঠে বসলে দুলকি চালের ফলে পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। তাই আমি একটু উপুড় হয়ে হাতির যে সামান্য একটু লোম থাকে, সেগুলোই খামচে ধরে থাকতাম।


আজও ময়মনসিংহে ফিরে আসার ভীষণ ব্যাকুলতা কাজ করে তার মনে। তিনি লিখেছেন, ময়মনসিংহ হয়ত খুব সু্ন্দর কোনো জায়গা নয়। অনেক গাছপালা ছিল, নদী ছিল, সুড়কির রাস্তা ছিল, ধুলো ছিল, রেলব্রিজ ছিল, দিগন্ত ছিল। কিন্তু সুইৎজারল্যান্ড তো আর নয়। তবু আমার কাছে কেন যে আজও সেই ময়মনসিংহের অফুরান রূপ মায়াঞ্জনের মতো লেগে আছে! এখনও মনে হয়, ইচ্ছেও হয়, সেই গান্ধা শহরটিতে ফিরে যাই। সেই উঠানঘেরা টিনের ঘর, মাটির ভিত, খাটা পায়খানা, পচা পাটের গন্ধ। আর জগদ্ধাত্রী ভাণ্ডারের কথা তো বলাই হয়নি। মেছোবাজার অঞ্চলে আমাদের একটা পেল্লায় কাপড়চোপড়ের দোকান ছিল। আমাদের গৃহদেবতা জগদ্ধাত্রীর নামে তার নাম রাখা হয়েছিল। সেই দোকানে বসতেন আমার জ্যাঠামশাই। মাঝেমধ্যেই জ্যাঠামশাই আমাকে সাইকেলের রডে বসিয়ে দোকানে নিয়ে যেতেন। কিনে দিতেন বালুসাই বা রসগোল্লা।  আজও কেন যে আমার ময়মনসিংহকে এক জাদুনগরী বলে মনে হয়, তা বুঝতে পারি না। আজও সেই তখনকার ময়মনসিংহে আমার বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। এই শহরেই বসবাস করবেন বলে দুর্গাবাড়িতে দাদু একটা পেল্লায় দু’মহলা পাকা বাড়ি বানিয়েছিলেন। তার সামনেই এক মস্ত পুকুর। আমি জানতাম, আমরা এক দিন সেই পাকা বাড়িটায় থাকব। থাকা আর হয়নি অবশ্য। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের ধারে বড় কালীবাড়ি রোডের বাড়িটাই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, আজও প্রিয়ই আছে। প্রায় সত্তর বছর পর সেই বাড়ি খুঁজতে গিয়ে দেখি, শুধু বাড়িটাই নয়, পুরনো আবহই লুপ্ত হয়ে গেছে। কিছুই আর তেমন চেনা লাগল না। 

ময়মনসিংহের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে শীর্ষেন্দু স্মৃতিচারণ করেন- চাকরি নিয়ে বাবা কলকাতায় চলে যাওয়ার বেশ কিছুদিন পরে মা, দিদি ও আমি কলকাতায় যাই। তার আগে অবশ্য বিস্তর কান্নাকাটি, হা-হুতাশের ব্যাপার ছিল। আমার ব্যক্তিগত বিরহ ছিল ময়মনসিংহের জন্য। আমার আসল দেশ ঢাকার বিক্রমপুর, মুন্সীগঞ্জ মহকুমার টঙ্গিবাড়ি থানার অন্তর্গত বাইনখাড়া গ্রাম। ময়মনসিংহ আমাদের দেশ নয়, তবু আমার এই জন্মশহর আমাকে এমনই মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল যে, আজও সেই তীব্র আকর্ষণ অনুভব করি। বলছি বটে শহর, কিন্তু এখন ভাবি, ময়মনসিংহকে কতটা শহরের তকমা দেওয়া যায়! আমরাই তো থাকতাম মাটির ভিটেওয়ালা টিনের চালের ঘরে, ঘরের পিছনে পুষ্করিণী, তার পাশে বিস্তীর্ণ ঢেঁকি আর কলমি শাকের জঙ্গল। চারদিকে আম, জাম, কামরাঙা, বেল, বাতাবি, চালতা আর হরেক গাছগাছালির নিবিড় সংসার। বাজার বা রেলস্টেশনে গেলে একটু শহর-শহর মনে হতো বটে, কিন্তু আদতে ময়মনসিংহ তখন একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছাড়া কিছুই নয়। পরিবহন বলতে ছ্যাকড়াগাড়ি, সারা শহরে একটি-দুটির বেশি মোটরগাড়ি ছিল না। রাস্তা ছিল লাল সুড়কির এবং অতিশয় এবড়োখেবড়ো। তবু সেই তিন-চার বছর বয়সে মনে হয়েছিল, এই শহর থেকে আমাকে নিয়ে গেলে আমি মরেই যাব। দাদু, ঠাকুমা, বমা, দাদামশাই, দিদিমা, ব্রজমাসি, আমার চার স্নেহশীল জেঠতুতো দাদা, জ্যাঠামশাই, জিষ্ণুমামা, জ্যোতিমামা, এদের ছেড়ে আমি বাঁচব কী করে? বাঁচব কী করে ব্রহ্মপুত্র ছাড়া? আর সব বাদ দিলেও, দাদুকে ছাড়া তো আমার চলবেই না! রাতে মায়ের বুক ঘেঁষে ঘুমটুকু ছাড়া আমার জাগ্রত সারাদিনই যে দাদুময়। দাদুরও শুনেছি, কাছারিতে গিয়ে আমার জন্য মন কেমন করত। নানা ছলছুতোয় মাঝে মাঝে তাড়াতাড়ি চলে আসতেন। তখনও ময়মনসিংহের বাইরে আমার কাছে আর জগৎ নেই। কোথাকার কোন কলকাতায় আমাকে কেন নিয়ে যাওয়া হবে, সেটাই আমার বোধগম্য হচ্ছিল না। ব্যাপারটা যে একটা ঘোরতর অন্যায়, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে! বড়রা যে কেন এত বোকা হয় কে জানে!

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ঘুরতে এসে শীর্ষেন্দু উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘বহুবার বাংলাদেশে এসেছি। কখনো বাংলাদেশ এলে, আরেক দেশে এসেছি বলে মনে হয়নি।’

ময়মনসিংহের আদিনিবাস নিয়ে বলতে গিয়ে স্মৃতিমেদুর হয়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘ময়মনসিংহে গিয়েছিলাম, আগের মতো আর নেই। সেখানে আমাদের কাঁচামাটির বাড়ি ছিল। সেইগুলো এখন ইটের বাড়ি হয়ে গিয়েছে। বাড়ির সামনের বড় মাঠটাও নেই। জমিদার বাড়ি ছিল, সেটাও ঠিক নেই। একটি স্কুল ছিল, সেটি খুঁজে পেয়েছিলাম। ছোটবেলায় আমরা যে ব্রহ্মপুত্রে স্নান করতাম, সাঁতরে বেড়াতাম, ওটা এখন চর হয়ে গিয়েছে। ব্রহ্মপুত্র এখন একটি অসুস্থ নদ। দূরে আমাদের একটি পাকা বাড়ি আজ হসপিটাল।’

বাংলা ভাষার অসংখ্য পাঠককে মুগ্ধতায় ডুবিয়ে রাখা, বাংলাদেশকে তুমুল ভালোবাসা এই লেখকের আজ জন্মদিন। তিনি এখন বাংলাদেশে না থাকলেও, তার স্মৃতিরা আজও মিশে আছে ব্রহ্মপুত্র নদে, ময়মনসিংহের আলো-হাওয়ায় কিংবা বিক্রমপুরে পূর্বজদের বসতভিটেয়।

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়  ময়মনসিংহ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: