লাল জবা-সাদা জবা

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

সাহিত্য

আশির দশকের কথা। তখন আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা ছিল লক্ষ্মীপুর উত্তরপাড়ার একেবারে শেষ প্রান্তে, আমাদের বাড়ির উঠোনজুড়ে। বাড়ির পাশে ছিল একটি

2026-10-24T11:06:32+00:00
2026-10-24T11:06:32+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সাহিত্য
লাল জবা-সাদা জবা
এম আব্দুল হালীম বাচ্চু
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আশির দশকের কথা। তখন আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা ছিল লক্ষ্মীপুর উত্তরপাড়ার একেবারে শেষ প্রান্তে, আমাদের বাড়ির উঠোনজুড়ে। বাড়ির পাশে ছিল একটি টিউবওয়েল। তার কাছেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল দুটি জবাগাছ— একটিতে লাল ফুল, অন্যটিতে সাদা। গাছ দুটি এখন আর নেই, কিন্তু তাদের ঘিরে থাকা শৈশবের দিনগুলো আজও আমার স্মৃতিতে জীবন্ত।

আমাদের বাবা ছিলেন স্নেহশীল মানুষ। মা সংসারের সব কাজ সামলাতেন পরম যত্নে। আমরা ছিলাম তিন ভাই— বড় ভাই আওয়াল, আমি মেজ আর ছোট ভাই খলিল। আমাদের সঙ্গে খেলত চাচাতো ভাই শেখ মুজিব ও চাচাতো বোন রোকেয়া। আমাদের বয়স তখন পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে। সামান্য আনন্দেই আমাদের মন ভরে যেত।

জবাগাছ দুটির পাশেই ছিল রান্নার দুটি মাটির চুলা, আর রান্নাঘরের ভেতরে ছিল আরও দুটি। ভোর হলেই মা রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। চুলায় শুকনো কাঠ জ্বলত, টুকটুক শব্দে আগুন নাচত, ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠোন পেরিয়ে আকাশে মিশে যেত। রান্নার গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকত জবা ফুলের মিষ্টি সুবাস। সেই সকালগুলোতে আমাদের বাড়িটা যেন এক টুকরো সুখের নীড় হয়ে উঠত।

আমাদের কাছে লাল আর সাদা জবাগাছ ছিল দুটি আলাদা রাজ্য। বড় ভাই বলত, ‘লাল জবা ফুলই সবচেয়ে সুন্দর। দেখতে একেবারে আগুনের মতো!’

আমি প্রতিবাদ করতাম, ‘না, সাদা জবা ফুলই বেশি সুন্দর। মনে হয় আকাশ থেকে সাদা মেঘ নেমে এসেছে!’

ছোট ভাই তখন কোনো একটি গাছ থেকে ঝরে পড়া ফুল তুলে নিয়ে বলত, ‘এই ফুলটা আমার!’

শেখ মুজিব আর রোকেয়া আমাদের কথার মাঝখানে নিজেদের রায় দিত। কখনো ফুল দিয়ে মুকুট বানাতাম, কখনো পাতা দিয়ে ঘর সাজাতাম। কেউ রাজা, কেউ মন্ত্রী, কেউ সৈনিক, আবার কেউ রাজকন্যা সেজে খেলায় মেতে উঠতাম। ফুল ঝরে পড়লে আমাদের আনন্দ আরও বেড়ে যেত। মনে হতো, প্রকৃতি বুঝি আমাদের জন্যই উপহার ছড়িয়ে দিয়েছে।

বাবা মাঝেমধ্যে উঠোনে এসে আমাদের খেলা দেখতেন। তিনি বলতেন, ‘গাছের ফুল ছিঁড়বে না। গাছকে যত্ন করলে গাছও তোমাদের আনন্দ দেবে।’

আমরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতাম। যদিও কিছুক্ষণ পরেই খেলতে খেলতে ভুলে যেতাম বাবার উপদেশ।
একদিন বর্ষার সকালে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।

রাতভর বৃষ্টি হয়েছিল। উঠোনের মাটি ভেজা, টিউবওয়েলের পাশে ছোট ছোট জলকাদা। সেদিন সাদা জবাগাছটির গোড়ায় গিয়ে দেখি, মাটি যেন কেউ খুঁড়ে রেখেছে। ভেজা মাটির ওপর কয়েকটি অচেনা পায়ের ছাপ। গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুলগুলোও এলোমেলো।

আমি বড় ভাইকে ডেকে বললাম, ‘দেখো তো, এখানে কে এসেছিল?’

তিনি ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘কিছু একটা লুকিয়ে আছে মনে হয়!’


আমাদের বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল। ছোট ভাই আমার হাত চেপে ধরল। রোকেয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে ঝোপটার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই ঝোপের ভেতর থেকে খসখস শব্দ হলো।

আমরা সবাই থমকে গেলাম।

আবার শব্দ। এবার একটু জোরে।

শেখ মুজিব ফিসফিস করে বলল, ‘ওখানে কিছু একটা আছে!’

কী আছে, তা দেখার সাহস কারও হলো না। আমরা কয়েক পা পিছিয়ে এলাম। হঠাৎ ঝোপের ভেতর একটা কালচে ছায়া নড়ে উঠতেই ছোট ভাইটা চিৎকার করে দৌড় দিল। আমরাও তার পিছু নিলাম। উঠোন পেরিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, ‘মা, জবাগাছের নিচে কী যেন আছে!’

মা রান্নাঘর ফেলে এসে আমাদের দিকে তাকালেন। আমাদের ভয়ার্ত মুখ দেখে বাবাকে ডাকলেন।

বাবা এগিয়ে এলেন। প্রথমে ভেজা মাটির ছাপগুলো দেখলেন, তারপর সাবধানে ঝোপের কাছে গেলেন। আমরা দূর থেকে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাবা একটা ডাল সরাতেই ভেতর থেকে আবার নড়াচড়া হলো।

আমরা নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলাম।

পরক্ষণেই বাবা হেসে উঠলেন।

‘আরে, এ তো একটা ছোট্ট ছাগলের বাচ্চা!’

আমরা একটু সাহস করে কাছে এগিয়ে গেলাম। সত্যিই, একটি ছোট ছাগলের বাচ্চা ডালপালার মধ্যে আটকে ছিল। তার গায়ে ভেজা মাটি, মুখের কাছে লাল জবার কয়েকটি পাপড়ি লেগে আছে। হয়তো ফুল খেতে এসে ঝোপে আটকে পড়েছিল। বাবা যত্ন করে তাকে বের করে আনলেন। বাচ্চাটি মুক্ত হয়েই লাফিয়ে উঠোনের অন্য প্রান্তে চলে গেল।

আমাদের ভয় মুহূর্তেই আনন্দে পরিণত হলো। খলিল হেসে বলল, ‘ও-ই তা হলে ফুল চুরি করতে এসেছিল!’

আমরা সবাই হেসে উঠলাম। বাবা মৃদু হেসে বললেন, ‘দেখলে তো, ভয় পাওয়ার আগে ভালো করে দেখতে হয়।’

ঠিক তখনই মা ভেতর থেকে ডাক দিলেন, ‘এসো, খেতে এসো। রান্না হয়ে গেছে।’

মাটির চুলায় তখন রান্নার শেষ আয়োজন। আমরা হাত-মুখ ধুয়ে মায়ের কাছে ছুটে গেলাম। বাইরে বৃষ্টিভেজা উঠোনে লাল-সাদা জবাগাছ দুটি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের পাতায় জমে থাকা জলবিন্দুতে সকালের আলো চিকচিক করছিল।

সময় গড়িয়ে গেল। আমরা বড় হলাম, শৈশব পেছনে পড়ে রইল। একসময় টিউবওয়েলের পাশের লাল ও সাদা জবাগাছ দুটি আর থাকল না। বদলে গেল বাড়ির উঠোন, বদলে গেল দিনের চেনা ছন্দ। শুধু স্মৃতির ভেতর রয়ে গেল সেই গাছ দুটি, আমাদের ছোটবেলার হাসি-খেলা আর মা-বাবার স্নেহমাখা উপস্থিতি।

আজও লাল জবা দেখলে মনে পড়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে ফুল নিয়ে তর্ক, ছোট ভাইয়ের দুষ্টুমি, শেখ মুজিবের হাসি আর রোকেয়ার মিষ্টি কথা। মনে পড়ে মাটির চুলায় মায়ের রান্না, ভোরের উঠোন আর বাবার স্নেহভরা মুখ। তখন বুঝিনি, এই সামান্য দৃশ্যগুলোই একদিন জীবনের অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।

এখন আর সেই উঠোনে আমাদের ছোটাছুটি নেই, টিউবওয়েলের পাশে ফুটে ওঠে না লাল-সাদা জবা। তবু কখনো ফুলগাছ দুটির কথা মনে পড়লে মনে হয়, শৈশবের সেই সকালগুলো যেন খুব দূরে নয়। শুধু আমরা আর সেখানে ফিরে যেতে পারব না।

জবাগাছ দুটি হারিয়ে গেছে বহু আগে। কিন্তু তাদের ঘিরে থাকা ছোট্ট পৃথিবীটি আজও আমার মনে অমলিন— যেখানে মা ছিলেন রান্নার ব্যস্ততায়, বাবা ছিলেন স্নেহের ছায়া হয়ে, আর আমরা পাঁচজন ছিলাম নিঃশঙ্ক আনন্দে ভরা একেকটি শিশু। সেই দিন আর ফিরবে না, শুধু স্মৃতিরা নীরব উঠোনে লাল-সাদা জবা হয়ে ফুটে থাকবে আজীবন।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   লাল  জবা  সাদা 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: