গ্রাফিক : সময়ের আলোমুগ্ধ মনের দেহলিতে
মঈনুস সুলতান
আর কিছু নয়—
খানিক শুষ্ক-খাবার পানীয়জল গুছিয়ে ব্যাকপ্যাক,
মানচিত্রে চোখ রেখে ভোরের অরুণিম আভায়
হেঁটে চলি সম্পূর্ণ অচেনা এ ট্র্যাক;
যেতে হবে আজ তুষারের সফেদ কর্দম মাড়িয়ে
চোখ চলে যায় সুনসান বহুদূর,
প্রান্তরের প্রাণরিক্ত ঘাসে মেঘের শুভ্র পালক
আকাশ থেকে নেমে আসে গুঁড়ি গুঁড়ি কর্পূর;
বনের হৃদমাঝারে ছড়ানো হিমেল শেফালি
তুষারের জায়নামাজে সেজদায় প্রতিবিম্বিত আকাশ,
মেহরাবে তার পাখির তরতাজা পদচিহ্ন—
মুগ্ধ মনের দেহলিতে দেখি পরম প্রকাশ,
এ ছাপের প্রজাতি সম্পূর্ণ ভিন্ন;
দুপুর অবধি হেঁটে যাই, উড্ডয়ন-প্রিয় পারিজাতের সন্ধানে
পেরিয়ে যাই আসমানি ছায়ায় নিমগ্ন জলের ঝোরা
পায়ের আঁকিবুঁকি চলে গেছে দিগন্তের পানে,
দিকবিচারি পথের শিথানে পালকের শরীর পাই না কোনখানে;
হাইক করেছি অনেক আজ— মেলেনি খোঁজ
ক্রমশ শেষ হয়ে আসে সম্ভাবনার মৌসুম,
দাঁড়িয়ে আছে বিষণ্ন বিকালে তুষার মাখা ব্যথিত বোধিদ্রুম।
মেঘ তাড়ানোর দিন
সঞ্জয় দেওয়ান
বাতাসের মিছিলে আততায়ী মেঘ
ভেসে বেড়ায় পূর্ব থেকে পশ্চিমে।
কালো মেঘ ব্যস্ত নগরের
আনাচে কানাচে অবিরাম দেখে
আলো ছায়ার দ্বৈরথ।
মেঘেদের হৈ-হল্লায় ক্লান্ত জনপদ
মহাসড়কে যানজট, বীভৎস বনভূমি।
চক্রব্যূহের ফাঁদে জনজীবন
অসম্পূর্ণ জ্ঞানে হারায় প্রাণ বালক অভিমন্যু।
নিরালম্ব মানুষ খোঁজে পরিত্রাতা,
খোঁজে পরিত্রাণ সঙ্গোপনে।
সংঘবদ্ধ মানুষ পণ করেছে,
আসন্ন বর্ষায় তাড়াবে আততায়ী মেঘ।
কিছু কিছু
তানভীর রাতুল
কিছু কিছু গন্তব্য আছে
যেখানে কম্পনে দৃঢ়তার অভাবে নরম।
কিছু কিছু প্রেম আছে
যেখানে পৃথিবী যথেষ্ট নয়, যেন বাকি থাকে একটা কদম।
কিছু কিছু আনন্দ আছে
যেখানে তুমি শিল্পের জন্য নিজেকেই শাস্তি দাও,
কারণ শিল্পই পাপ।
কিছু কিছু নীরবতার মুহূর্ত আছে
যেখানে নারীর ঠোঁটের উত্তাপ
তোমাকে ভাবায় যে বিনয় আসলে শুধুই যৌনতার প্রশ্ন।
কিছু কিছু চুল আছে উল্কাপিণ্ডের রঙে
যে রেখাটি শয়তানের নিজের আঁকানো।
কিছু কিছু নিঃসঙ্গতা আছে
যেখানে তুমি এক চোখে তাকাও,
আর দেখো শুধু লবণ।
কিছু কিছু শীতল মুহূর্ত আছে
যেখানে তুমি কবুতরের শ্বাসরোধ করে
ডানা থেকে করো উষ্ণতা আহরণ।
কিছু কিছু ভারের মুহূর্ত আছে
যেখানে তুমি অনুভব করো, তুমি পড়ে গেছ
যারা পড়ে তাদের মধ্যেই।
কিছু কিছু নীরবতা আছে
যেগুলো তোমাকে প্রকাশ করতে হবে, শুধু তোমাকেই!
কাঁদো
সুবর্ণা দাস
কান্না ছাড়া হয় কী ভালোবাসা?
কাঁদো সখা কাঁদো—
প্রেম বিলাতে নিতাই গোরা
কেঁদে কেঁদে হলো সারা
তাই বলে কি থামল তারা?
রক্তবরণ হোক না হৃদয়
তবু আশায় বাঁধো,
কাঁদো সখা কাঁদো।
রামীর প্রেমে মুগ্ধ কবি
দগ্ধ জীবন তবু সবই,
প্রেমের জন্য সাধন
ধ্যানে জ্ঞানে সকল ক্ষণে
অন্তরালের নীরব কোণে
প্রেমিক জনাই আপন।
শুদ্ধ প্রেমের যন্ত্রণা ভার
জীবনভূমি ব্যথার পাহাড়
তবু তো প্রেম মানল না হার
জীবন মরণ সাধো।
স্রষ্টা বলো, সৃষ্টি বলো
নর বলো, নারী বলো
প্রেম ছাড়া কী জ্বলবে আলো?
প্রেম কে মর্মে বাঁধো,
কাঁদো সখা কাঁদো, প্রেমের জন্য কাঁদো।
হেমন্ত
বকুল আশরাফ
পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটি। বলল, ‘চলুন, দেখেছেন কাশবনের কান্না? আপনারা তো শুধুই দোলায়িত শুভ্র ফুল ভালোবাসেন, দেখুন ছিন্নভিন্ন দেহ, কী পরিণতি আজ।’
পাশের নদীটির ক্ষীণ শরীর দেখিয়ে বলল, ‘ভরা যৌবনের কথাই শুধু শুনেছেন, দেখুন, কান পাতুন, শুনুন, শুকনো নদী চলার দীর্ঘশ্বাস!’
তারপর ঘন কুয়াশার ভেতর টেনে নিয়ে গেল। আমি শুধু তার হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম। বলল, ‘কী, আজ দেখলেন তো অশরীরী মেয়ে!’ আমি ‘হু’ বলতেই ঋতু নামক বইটির ভাঁজ খুলতে খুলতে সে শুয়ে পড়ল, কাছে টেনে নিয়ে নিবিড় আহ্বানে বলল, ‘আমি হেমন্ত’।
দুঃখভোলা সুখ
নাজমা বেগম নাজু
অনেক আগেই দুঃখভোলা জনমদুঃখী ঘর বুনেছি
অনেক আগেই প্রথম ফোটা কদম রেনুর গন্ধটাকে
বুকে তো নয় সোঁদা মাটির নিঝুম বুকে ঋদ্ধ রেখেছি
এই যে আমার দুঃখবোনা মহাসুখী দিন
জগৎসেরা সুখী ভেবে বিষাদ মাখা অস্ত বিকাল
নিমেষ ফেরায় চোখ
যেন এইখানেতে যোগ্য সে নয়-
আমার আনন্দস্রোত দুঃখে ভাসাই
দুঃখ নদীর গহীন বালুচরে।
স্রোতের সীমায় অশ্রুরেখা, দুঃখ শোকের
সুতোয় গাঁথা নকশি পাতা, অশেষ নিদাঘ নীল।
কোন জনমের পায়ে হাঁটা পথ
পথের ধুলোয় বন্য হাহাকার
দুঃখ দুঃখ গন্ধটাকে নিশ্বাসে নিই, যত্নে সাজাই
সযতনে নাম নিখে দিই জনমদুঃখী সুখ।
চন্দ্রকথা, চাঁদনী আকাশ-বুকটা চিরে
জোছনা পরাগ নামে
জড়িয়ে বুকে খুব কাছে নিই দুঃখ যে তার নাম।
কবে যেন ঘর ছেড়েছি ঘরের নেশায়
সেই তখন থেকেই ঘর হারা এক শূন্য হৃদয়
হৃদমাঝারে সঙ্গোপনে রাখি
প্রিয় আমার, অনেক প্রিয় জনমদুঃখী সুখ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে