সহযাত্রী

ইলিয়াস ফারুকী

সাহিত্য

বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে অফিস শেষে বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন সাধারণের পরিবহন এলাকাগুলোতে ভিড় বেড়ে যায়। পরিবার ছাড়া বিভিন্ন জেলায় কর্মরতরা শুক্র

2026-10-17T01:57:38+00:00
2026-10-17T01:57:38+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সাহিত্য
সহযাত্রী
ইলিয়াস ফারুকী
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে অফিস শেষে বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন সাধারণের পরিবহন এলাকাগুলোতে ভিড় বেড়ে যায়। পরিবার ছাড়া বিভিন্ন জেলায় কর্মরতরা শুক্র ও শনিবারের সুযোগ নেয়। আমি কিন্তু ওদের দলের লোক না। তবুও ফিরছি আমার বসবাসের শহর ঢাকায়। 

দাফতরিক কাজে ফেনী এসেছিলাম, কাজ সম্পন্ন তাই চিন্তা করলাম যত রাতই হোক, ফিরে যাব। যাত্রীর ভিড়ের কারণে কোনো গাড়ি তার নির্দিষ্ট সময় ঠিক রাখতে পারছিল না। আমার গাড়ির ক্ষেত্রেও তাই হলো। আধাঘণ্টা দেরি। প্রচণ্ড গরমে ঘামে শরীর ছপছপ করছে। চিন্তা করলাম গাড়ির ভেতরের পাখা নিশ্চয় চালু রয়েছে। আমি গাড়িতে চড়লাম। আমার নির্ধারিত আসনে গিয়ে দেখি পাশের আসনে এক  তরুণী। দ্বিধায় পড়ে আসন নাম্বার দেখার চেষ্টা করলাম। মেয়েটাই বলল, ‘স্যার জি-১ আর জি-২।’ জি-১ এ মেয়েটি বসেছে। বুঝলাম জি-২ টাই আমার আসন। তবু বসতে ইতস্তত করছি, আমার অস্বস্তি লাগছে। 

মেয়েটার কাছে জানতে চাইলাম ‘আমি বসলে কোনো সমস্যা নেই তো।’ সেও সাবলীলভাবে উত্তর দিল, ‘কোনো সমস্যা নেই, আপনি বসুন।’ আমি সংকোচ নিয়েই তার পাশে আমার জন্য বরাদ্দ আসনটাতে বসলাম। গাড়ি যাত্রা আরম্ভ করতেই মেয়েটার কথার রেডিও চালু হয়ে গেল। মেয়েটি বলল, ‘ঢাকা কোথায় নামবেন, স্যার।’ 

বললাম, ‘বাড্ডা লিংক রোড।’ এবার প্রশ্ন, ‘বাড্ডা লিংক রোড কি আবদুল্লাহপুরের পরে।’ আমি আবারও উত্তর দিলাম, ‘না, আবদুল্লাহপুরের অনেক আগে।’ সে বলল, ‘স্যার আমি আবদুল্লাহপুর যাব।’ জিগ্যেস করলাম, ‘ওখানে কে আছে কী জন্য যাচ্ছ, সঙ্গে কে আছে।’ এবার আমার চমকে যাওয়ার পালা, ‘স্যার ওখানেই  আমার বাড়ি। আমার সঙ্গে কেউ নেই। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। তাই বাড়ি চলে যাচ্ছি। এক ভাই আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে গেছেন।’ 

জানতে চাইলাম, ‘তুমি ঠিকঠাক মতো বাড়ি যেতে পারবে তো!’ মেয়েটি বলল, ‘হ্যাঁ স্যার ও নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তা ছাড়া আমার জন্য লোক অপেক্ষা করবে।’

আমি কিছুটা দ্বিধান্বিত, কারণ কিছুক্ষণ আগে সে জানতে চাচ্ছিল লিংক রোড আর আবদুল্লাহপুরের অবস্থান সম্পর্কে, আর এখন বলছে ওর বাড়ি নাকি আবদুল্লাহপুরের কাছেই। আমি সমূহ বিপদসহ অনেক কিছু চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলাম, কারণ এমন অনেক ঘটনা শুনেছি যে ভ্রমণরত অবস্থাতে এভাবেই অনেক প্রতারণা এবং মেয়েলি বিড়ম্বনার ঘটনা ঘটে। আমি ভীষণভাবে আতঙ্কিত ছিলাম। 

খুব সতর্কতার সঙ্গে মেয়েটার কাছ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখছিলাম। আমার অজান্তেও যেন কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়। কিন্তু মেয়েটার ব্যবহার ছিল সাবলীল, সে স্বচ্ছন্দে নিজের নড়াচড়া করে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে তার চেয়ারের পেছনের অংশ যতটুকু সম্ভব পেছনে ঠেলে দিয়ে আরামে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল এবং নিশ্চিন্তে চিকন স্বরে নাসিকা গুঞ্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার পেছনের সিটের যাত্রীর অসুবিধা হওয়া সত্ত্বেও অজানা কারণে তিনি চুপ করে থাকলেন।

কিছুক্ষণ পরই টিকেট চেকার বা সুপারভাইজার এলেন। আমার এবং আশপাশের সবার টিকেট চেক করে চলে যেতে উদ্যত হলে আমি মেয়েটাকে দেখিয়ে বললাম, ‘ওর টিকেট দেখলেন না যে?’ কথাটা বলতেই সুপারভাইজার অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর মুচকি হেসে বলল, ‘স্যার, পানি খান।’ বলে সে তার কাজে মনোযোগ দিল।

বাসের যাত্রা বিরতিতে আমি নামলাম, আবার উঠে এলাম কিন্তু মেয়েটার কোথাও কোনো খবর পেলাম না। যাই হোক, গাড়ি ছেড়ে দিলে আমি কিছুটা তন্দ্রার ঘোরে চলে গেলাম, হঠাৎ কানে এলো এক নারীর তীব্র আর্তচিৎকার। আমি হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলাম। দেখি কোথাও কোনো সমস্যা নেই। রাতের অন্ধকার ভেদ করে গাড়ির হেডলাইট গাড়িকে সামনের পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে সুনসান। আমি পাশের আসনে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখি সে মুচকি মুচকি হাসছে। আমি বিব্রত, বাসের নেট পকেট থেকে পানির বোতলটা টেনে নিয়ে ঢক ঢক করে কয়েক ঢোক পানি গলায় ঢেলে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর ভাব ধরলাম, কিন্তু আমার ভেতরে তখন রোদ-ছায়া সংশয়।

অজানা অস্থিরতা থেকে নিজেকে লুকোতে আমি আমার চিন্তাকে পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য নিয়োগের চেষ্টা করলাম। এভাবে অলটি পলটি করতে করতে আমার নামার সময় হয়ে গেল। সৌজন্য রক্ষার্থে আমি মেয়েটাকে বললাম, ‘ঠিক আছে আমার নামবার সময় হয়ে এসেছে, আমি এগিয়ে যাই। মেয়েটা হাসল, তারপর হঠাৎ সম্বোধন বদলে বলল, ‘আঙ্কেল আপনি খুব ভালো মানুষ। আমার জন্য দোয়া করবেন। আর আগামীকালকের পত্রিকা পড়তে ভুল করবেন না।’ আমি ‘আচ্ছা’ বলে বাসের দরজার কাছে চলে এলাম। 

বনেটের ওপর বসে সুপারভাইজারকে বললাম, ‘ভাই আমার পাশে বসা মেয়েটা একা। ওকে খেয়াল রেখে নামিয়ে দিয়েন। কোনো সমস্যা যেন না হয়।’ সুপারভাইজার আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার আপনার কী, হয়েছেটা কী। আপনার পাশের সিট তো খালি, ওখানে কেউ বসে নেই। ওই টিকেটের যাত্রী আসেনি।’

আমার নেমে যাওয়ার নির্দিষ্ট স্থান এলে বাস থামল, সুপারভাইজার বিনয়ের সঙ্গে আমাকে বললেন, ‘স্যার নামুন, আপনার নামার স্থান এসে গেছে।’ আমি নিচে নেমে বাইরে থেকে বাসে আমার বসার জানালার দিকে তাকালাম। দেখলাম আমাদের সিটের ওপর ধোঁয়ার মতো আবছা ছায়া।

পরের দিন সকালে কৌতূহলবশত একটা খবরের কাগজ কিনলাম, দেখলাম প্রথম পৃষ্ঠার নিচের দিকে একটি খবর, ‘ভালোবেসে লাল শাড়িতে গাজীপুরের আদ্রিতা ফেনী এসে সাদা কাপড়ে বিদায়।’

খবরটার সঙ্গে গতকালকের আমার সহযাত্রী সেই মেয়েটির ছবি। আমি তো বিভ্রান্ত, এ কেমন করে হয়!

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   সহযাত্রী  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: