একটা বিশাল বন ছিল। বনের নাম ছিল শালবন। চারদিকে উঁচু উঁচু শালগাছ, সেগুনগাছ, বটগাছ আর নানা রকমের গাছপালা। কোথাও ঝরনা, কোথাও ছোট নদী, কোথাও আবার সবুজ ঘাসে ঢাকা খোলা মাঠ। সকাল হলে পাখিরা গান গাইত, প্রজাপতিরা ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াত, আর সন্ধ্যা নামলে ঝিঁঝি পোকার ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।
এই বনে বাস করত অনেক হাতি। হাতিদের মধ্যে ছিল বুড়ো হাতি, যুবক হাতি, মা হাতি, বাবা হাতি এবং অনেক ছোট্ট হাতির বাচ্চা। বনের একেবারে পাশেই ছিল কয়েকটি গ্রাম। গ্রামের মানুষরা চাষাবাদ করত, গরু-ছাগল পালন করত, কেউ বাজারে দোকান চালাত, কেউ মাছ ধরত, কেউবা ক্ষেতের কাজ করত। কিন্তু হাতিদের সঙ্গে গ্রামের মানুষের তেমন বন্ধুত্ব ছিল না। বরং হাতিদের মনে মানুষ সম্পর্কে একটা অদ্ভুত ধারণা তৈরি হয়েছিল। তারা ভাবত, মানুষ খুব খারাপ জাতি।
একদিন বনের মাঝখানে কয়েকটি হাতি খাবার খেতে খেতে মানুষের কথা বলছিল। বৃদ্ধ হাতি ধীরেশ বলল, ‘মানুষকে কখনো বিশ্বাস করবে না। ওরা নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া করে, মারামারি করে। সুযোগ পেলেই পশুপাখিদেরও ক্ষতি করে।’ আরেক হাতি বলল, ‘আমি ছোটবেলায় শুনেছি, গ্রামের মানুষ নাকি বনের পশু দেখলেই তাড়িয়ে দেয়।’ কেউ বলল, ‘মানুষের কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায়, ততই ভালো।’
এই কথাগুলো শুনে ছোট্ট হাতিরাও মানুষকে ভয় পেতে শুরু করল। তাদের মধ্যে ছিল একটি ছোট্ট হাতির বাচ্চা। তার নাম ছিল টুকু। টুকু ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারাক্ষণ মায়ের পেছনে পেছনে ঘুরত, কখনো প্রজাপতি ধরতে চাইত, কখনো গাছের পাতা শুঁড় দিয়ে টানত, আবার কখনো অন্য হাতির বাচ্চাদের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করত। টুকুর মা মায়াবতী আর বাবা গজরাজ তাকে সবসময় চোখে চোখে রাখত।
একদিন সকালে টুকু তার কয়েকজন বন্ধু হাতির সঙ্গে খেলছিল। তারা বনের একটা পরিচিত জায়গায় লুকোচুরি খেলছিল। খেলতে খেলতে টুকু একটা রঙিন প্রজাপতির পেছনে ছুটল। প্রজাপতিটা কখনো এদিকে যায়, কখনো ওদিকে যায়। টুকুও তার পেছনে ছুটতে ছুটতে বনের পরিচিত পথ থেকে অনেক দূরে চলে গেল। একসময় সে বুঝতে পারল, আশপাশটা তার একেবারেই চেনা নয়। সে চারদিকে তাকাল।
কোথাও তার মা নেই। বাবা নেই। বন্ধুরাও নেই। টুকু ভয় পেয়ে গেল। ‘মা... মা...’, সে ডাকতে লাগল। কিন্তু কোনো উত্তর এলো না।
এদিকে হাঁটতে হাঁটতে টুকু বুঝতেই পারেনি যে সে বনের সীমানা পেরিয়ে গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছে। একসময় সে একটি গ্রামের মাটির রাস্তার ওপর এসে দাঁড়াল। গ্রামের কয়েকজন মানুষ তাকে দেখতে পেল। একজন কৃষক অবাক হয়ে বলল, ‘আরে! এ তো হাতির বাচ্চা!’ আরেকজন দৌড়ে এসে বলল, ‘বাচ্চাটা একা কেন? এর মা-বাবা কোথায়?’ কেউ ভয় পেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে গেল। আবার কয়েকজন কৌতূহলী হয়ে একটু কাছে এলো। টুকু ভয়ে কাঁপছিল। সে ভাবল, ‘নিশ্চয়ই মানুষ আমাকে মেরে ফেলবে!’ কারণ ছোটবেলা থেকে সে মানুষের সম্পর্কে শুধু খারাপ কথাই শুনে এসেছে।
কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। একজন বৃদ্ধ কৃষক ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না তুমি। আমরা তোমার কোনো ক্ষতি করব না।’ টুকু অবাক হয়ে বৃদ্ধ লোকটির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর গ্রামের এক মহিলা বাড়ি থেকে কয়েকটি পাকা কলা নিয়ে এসে বললেন, ‘বেচারা নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত। ওকে কলা দাও।’
টুকু প্রথমে ভয়ে এগোল না। তারপর ক্ষুধার কারণে ধীরে ধীরে কলাগুলোর কাছে গেল। একটা কলা শুঁড় দিয়ে তুলে মুখে দিল।
তারপর আরেকটা। তারপর একসঙ্গে কয়েকটা। গ্রামের শিশুরা দূরে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে হাসতে লাগল। কেউ বলল, ‘দেখো, হাতির বাচ্চাটা কলা খাচ্ছে!’ কেউ বলল, ‘কী সুন্দর!’ কিন্তু কেউ তাকে বিরক্ত করল না। কেউ পাথর ছুড়ল না। কেউ লাঠি নিয়ে তাড়া করল না।
বরং গ্রামের মানুষ সবাই মিলে ভাবতে লাগল, কীভাবে তাকে নিরাপদে বনে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। একজন কৃষক বললেন, ‘এটা নিশ্চয়ই পথ হারিয়ে এখানে এসেছে। এর মা-বাবা এখন নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছে।’
আরেকজন বললেন, ‘চলো, বনের যে পথটা এইদিকে গেছে, ওকে সেই পথ পর্যন্ত নিয়ে যাই।’
গ্রামের কয়েকজন মানুষ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে টুকুর সামনে সামনে হাঁটতে লাগল। টুকুও তাদের পেছনে পেছনে চলল। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা তাকে বনের পুরোনো পথের কাছে নিয়ে গেল।
এক লোক বলল, ‘এই পথ দিয়ে গেলে তুমি তোমার বনের কাছে পৌঁছে যাবে।’ টুকু কিছুক্ষণ মানুষের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ছোট্ট মনে তখন একটা নতুন প্রশ্ন জন্ম নিল, ‘এরা তা হলে খারাপ মানুষ নয়?’
অন্যদিকে তখন বনে শুরু হয়ে গেছে তোলপাড়। টুকুকে খুঁজে না পেয়ে তার মা মায়াবতী পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। ‘টুকু! টুকু! কোথায় গেলি বাবা?’ বাবা গজরাজও শুঁড় উঁচিয়ে চারদিকে গন্ধ শুঁকছিল। কিন্তু কোথাও টুকুর সন্ধান পাওয়া গেল না।
একসময় খবর ছড়িয়ে পড়ল, টুকু বনের বাইরে চলে গেছে। এই খবর শুনে পুরো হাতির পাল আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। বৃদ্ধ ধীরেশ বলল, ‘হায় আল্লাহ! যদি মানুষের গ্রামে ঢুকে থাকে?’ আরেক হাতি বলল, ‘মানুষ নিশ্চয়ই ওকে মেরে ফেলেছে!’ কেউ বলল, ‘আমরা তো সবসময়ই বলেছি মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না!’
মায়াবতী তখন মাটিতে বসে শুঁড় দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে কাঁদছিল। ‘আমার টুকুকে ফিরিয়ে দাও! আমার টুকুকে ফিরিয়ে দাও!’ তার কান্না শুনে অন্য হাতিদেরও চোখে পানি এসে গেল। কেউ গাছের নিচে বসে রইল। কেউ খাবার মুখে তুলল না। কেউ নদীর ধারে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। ছোট হাতিরা খেলাধুলা বন্ধ করে দিল। পুরো বন যেন হঠাৎ নীরব হয়ে গেল। সন্ধ্যার আগে এক হাতি দৌড়ে এসে বলল, ‘আমি মানুষের গ্রামের দিক থেকে এসেছি। কোথাও টুকুকে দেখতে পাইনি।’ এই কথা শুনে সবাই আরও ভেঙে পড়ল। গজরাজ মাথা নিচু করে বলল, ‘আমার বাচ্চাকে আমি রক্ষা করতে পারলাম না।’
মায়াবতী হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল, ‘আমার টুকু আর বেঁচে নেই!’
সেই মুহূর্তে পুরো বন যেন কান্নায় ভেঙে পড়ল। কেউ জানত না, যাকে মৃত ভেবে সবাই শোক করছে, সেই টুকু তখন বনের পথ ধরে আনন্দে ছুটে আসছে। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে হঠাৎ একটা পরিচিত ডাক শোনা গেল, ‘মা!’ মায়াবতী প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না। সে কান খাড়া করল। আবার ডাক এলো, ‘মা!’ মায়াবতী হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, ‘এটা... এটা তো টুকুর গলা!’
সব হাতি একসঙ্গে সেই দিকে তাকাল। দেখা গেল, ছোট্ট টুকু দৌড়ে বনের ভেতর ঢুকছে! মায়াবতী ছুটে গেল তার দিকে। গজরাজও ছুটল। এক মুহূর্তের মধ্যে টুকুকে ঘিরে ফেলল পুরো হাতির পাল। কেউ তাকে শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরল, কেউ আদর করল, কেউ আনন্দে শুঁড় উঁচিয়ে ডাকতে লাগল। মায়াবতী কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তুই কোথায় ছিলি বাবা? আমরা তো ভেবেছিলাম তোকে মানুষ মেরে ফেলেছে!’
টুকু অবাক হয়ে বলল, ‘মানুষ আমাকে মারবে কেন?’
সবাই থমকে গেল। ধীরেশ জিগ্যেস করল, ‘তা হলে মানুষ তোকে কিছু করেনি?’ টুকু মাথা নাড়ল, ‘না। বরং মানুষ আমাকে খুব ভালোভাবে দেখেছে।’
সবাই অবাক। টুকু বলতে লাগল, ‘আমি পথ হারিয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলাম। প্রথমে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোমরা যেমন বল— মানুষ নিশ্চয়ই আমাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু তারা কেউ আমাকে মারেনি। একজন মানুষ আমাকে কলা দিয়েছে। আরেকজন কলাগাছ কেটে দিয়েছে। কেউ আমাকে ভয় দেখায়নি। কেউ আমাকে আঘাত করেনি। বরং সবাই মিলে আমাকে বনের পথ দেখিয়ে দিয়েছে।
হাতিদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। একজন বলল, ‘সত্যি?’ টুকু বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যি। তারা চাইলে আমার ক্ষতি করতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। তারা বরং বলেছে, আমার মা-বাবা নিশ্চয়ই আমার জন্য চিন্তা করছে।’
গজরাজ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘তা হলে এতদিন আমরা মানুষ সম্পর্কে যা ভেবেছি, তার সবটাই কি ভুল?’
টুকু বলল, ‘আমার তো তাই মনে হয় বাবা। কিছু মানুষ খারাপ হতে পারে, কিন্তু তাই বলে সবাই খারাপ নয়। যেমন আমাদের মধ্যেও সবাই একরকম নয়।’ বৃদ্ধ ধীরেশ মাথা নিচু করল। সে বলল, ‘তুই ঠিকই বলেছিস টুকু। আমরা না জেনে একটা পুরো জাতিকে বিচার করেছি। এটা আমাদের ভুল হয়েছে।’ মায়াবতী টুকুকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘আজ তুই শুধু আমাদের কাছে ফিরে আসিসনি বাবা, আমাদের একটা বড় শিক্ষা দিয়েও ফিরেছিস।’
সেদিন রাতে হাতিদের মধ্যে আর কেউ মানুষের বিরুদ্ধে খারাপ কথা বলল না। বরং সবাই ঠিক করল, তারা আর কোনো প্রাণী বা মানুষকে শুধু শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে বিচার করবে না।
পরদিন সকালে গজরাজ বনের সব হাতিকে নিয়ে বলল, ‘আজ থেকে আমরা একটা কথা মনে রাখব, কাউকে না জেনে তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা যাবে না। সত্য জানতে হলে নিজের চোখে দেখতে হবে, নিজের মনে বুঝতে হবে।’
দূরে তখন গ্রামের দিক থেকে ভেসে আসছিল মানুষের কণ্ঠ। আর বনের ভেতর ছোট্ট টুকু তার বন্ধুদের সঙ্গে আবার খেলতে শুরু করেছে। তার মুখে আনন্দের হাসি। কারণ সে জানে, পৃথিবীতে শুধু ভয় আর শত্রুতা নেই। আছে মায়া। আছে দয়া। আছে ভালোবাসা। আর কখনো কখনো একজন ছোট্ট হাতির বাচ্চাও বড়দের ভুল ধারণা বদলে দিতে পারে।’
কাউকে না জেনে বা অন্যের মুখে শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা উচিত নয়। একটি মানুষ বা একটি প্রাণীর আচরণ দিয়ে পুরো একটি জাতি বা গোষ্ঠীকে বিচার করা ঠিক নয়। সত্যকে জানতে হলে মন খোলা রাখতে হয় এবং নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সত্যকে বুঝতে হয়।
সময়ের আলো/মহু