অন্তঃসারশূন্য অন্তঃসলিলা
গোলাম কিবরিয়া পিনু
বড় নদীর সঙ্গে ছোট নদীর সখ্য থাকে
ছোট নদীর সঙ্গে বড় নদীরও!
নদীতে নদীতে সংযোগ না থাকলে
কোনো নদী একা বাঁচতে পারে না!
হিমালয়ের শৃঙ্গ থেকে সৃষ্ট জলধারা নিয়ে
যে নদীটা প্রবহমান—
তার জলে চারণভূমি চনমনে হয়ে থাকে,
কৃষিজমি ফসলের সৌন্দর্য নিয়ে বাঁচে,
নাচে মাছেরা জলের বৈভবে!
তারপরও এতটা করুণ অবস্থা কেন তার?
সেই নদী কার লোলপড়া লোভে
তরতাজা থাকতে পারছে না!
নদীকে কতভাবে যে হত্যা করা হচ্ছে—
বক, গাঙশালিক ও হাঁসেরা তা বুঝতে পারে,
মানুষরা তা বুঝতে পারছে না—
অথচ মানুষের উপকার করে সে সবচেয়ে বেশি,
পেশিবহুল মানুষই হয়ে যাচ্ছে তার নির্মম হত্যাকারী!
নদীর সঙ্গে নদীর সংযোগ ও মৈত্রী না থাকলে
নদীর লাবণ্য ও স্বচ্ছতা থাকে না!
নদীর সঙ্গে মানুষের যোগসূত্র না থাকলে
মানুষও তার জীবনের ঊর্মিমালা হারিয়ে ফেলবে!
তারপরও নদীকে পর করে রাখি কেন?
একটা নদী মরে গেলে
অন্য নদীও মরে যায়!
অন্তঃসারশূন্য হয়ে গেলে অন্তঃসলিলা,
মানুষের অন্তর থেকে কী লাভ?
দীঘির জলে পদ্ম ফোটে
আনোয়ার কামাল
নীল আকাশে তুলো মেঘের ভেলা উড়ে যায়,
শালিক ডালে রোদের ঝিলিক ফড়িং ধরে খায়।
কাশফুল সব নদীর চরে দোলা দিয়ে যায়,
মুক্তোঝরা শিশির ভেজা সবুজ ঘাসটায়।
শিউলি তলায় গন্ধ ভাসে নরম ভোরে ঠিক,
ভোরের আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে চারিপিঠ।
শ্বেতশুভ্র এই শান্ত রূপ মন জুড়িয়ে দেয়,
শরৎ রানী শাড়ি পরে কাশবনের ডানায়।
সোনার রোদে ধানের ক্ষেতে ঢেউ খেলে যায় বায়,
সবুজ পাতা আলোর নাচন আলোর আঙিনায়।
দীঘির জলে পদ্ম ফোটে, মন যে কেমন করে,
শরৎ এলো খুশির দোলা নিয়ে ঘরে ঘরে।
কবি
মিনহাজ উদ্দিন শপথ
প্রত্যেক মানুষের প্রিয় কিছু রং থাকে
প্রিয় ফুল, প্রিয় দিন, প্রিয় গান...
আমার একজন প্রিয় কবি আছেন— সোহরাব পাশা
দীর্ঘসুতোয় স্বপ্নবাঁধা শব্দঘর
রোদ-বৃষ্টি আঁচলে দ্যুতির প্রহর
আমার বিশ্বাসের সাম্পান
প্রত্যাশার দেয়ালে মজবুত সাদা পলেস্তারা
জলেভেজা বাড়িগুলো ভেতরের এক আলোরসম্ভার
প্রার্থনার জ্যোৎস্নার সফেদ মাদুর
আমার প্রিয় খুব মজবুত দুপুর এক
ধুলো-জলে কখনো ভেঙে পড়ে না
সতেজ ভোরের মতো এই জীবন চোখে
সবুজ গান গায় বারবার।
শূন্যতা
নাসরীন নঈম
সাদা কাগজে গেঁথে রাখা সময়
কিছু দুঃখ আলো কিছু আঁধার
চোখজুড়ে প্রতিশোধ
টুকরো টুকরো আমি বসে আছি ভেজা বালির ওপর
ঘুরে বেড়াই জীবনের অলিগলি
পাথরের বেদিতে পাখির পালক সময়ের বিন্দুতে চেনামুখ
দুধে ভেজানো চিতই পিঠা
ধুয়ে আসে খাঁ খাঁ শূন্যতা।
দেবতা জেনাস
রেজাউল কারীম
এতকাল যা যা করার কথা ছিল,
তার কিছুই করতে পারিনি আমি।
যা যা বলার কথা ছিল,
তারও কিছুই বলতে পারিনি।
এতকাল আমি শুধু না করা ইচ্ছেগুলোকে
আরও বেশি প্রশ্রয়ে রেখেছি,
ঝাঁপ দিয়েছি দীর্ঘশ্বাসের আগুনে।
না বলা কথাগুলোকে হীরের জামা পরিয়ে
বাঁচতে দিয়েছি একা একা।
এইসব না-বলা, না-করা নিয়ে
আমার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই,
নেই কোনো বিষাদের উল্কি আঁকা।
এতকাল আমার শুধু মনে হয়েছে,
আমি অপেক্ষা করেছি আমার জন্য
এবং উপেক্ষা করেছি আমার আমাকে।
এতকাল আমি ছিলাম আশ্চর্য দেবতা জেনাস!
ধলেশ্বরী
মাসুদ অর্ণব
সগর্বে বলি— আমারও আছে একজন ঈশ্বরী
কখনো করি না গোপন— নাম তার ধলেশ্বরী;
ধলেশ্বরী ঈশ্বরী হয়ে আছে বিবর্ণ এই জীবনে
শূন্যতার ঢেউয়ে ভেসে বেড়াই না জনে জনে।
ধলেশ্বরী শুধু প্রিয় নদী না প্রিয় রমণীও বটে
কত ঢেউ হৃদয় ছুঁয়ে যায়— যখন দাঁড়াই তটে।
আমি তো জানি ধলেশ্বরীর প্রতি আমার কেমন দৃষ্টি
দীর্ঘপথ হাঁটা জীবনেও কি পূর্ণতা পায় কোনো সৃষ্টি?
অজানার মাঝেও জেনেছি— আমি প্রকৃতির অনুদান
আমার ঈশ্বরী আমার ভেতরে বাইরে থাকুক বহমান।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে