স্বর্ণা যাবে মেলায়

মাসুদ রানা

সাহিত্য

শরৎকাল এলেই প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা। নদীর পাড়জুড়ে ফুটে ওঠে সাদা

2026-10-10T14:08:18+00:00
2026-10-10T14:08:18+00:00
 
  শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সাহিত্য
স্বর্ণা যাবে মেলায়
মাসুদ রানা
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৮ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
শরৎকাল এলেই প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা। নদীর পাড়জুড়ে ফুটে ওঠে সাদা কাশফুল। দূর থেকে মনে হয়, নদীর তীরে যেন সাদা ফুলের মেলা বসেছে। শীতল বাতাসে দুলতে থাকে কাশফুলের বন। এমন সুন্দর দিনে কার না মন চায় ঘুরে বেড়াতে!

বারো বছরের স্বর্ণাও শরৎকে খুব ভালোবাসে। সে চঞ্চল আর হাসিখুশি একটি মেয়ে। দুর্গাপূজা এলেই তার আনন্দ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। কারণ, পূজার সময় বসে মেলা। সেখানে কতরকম খেলনা, পুতুল, চুড়ি, ফিতা আর মজার মজার খাবার পাওয়া যায়!

এবার স্বর্ণা ঠিক করেছে, বাবার সঙ্গে মেলায় যাবেই। অনেক দিন ধরে সে বাবার কাছে বায়না ধরছে।—বাবা, এবার আমাকে পূজার মেলায় নিয়ে যাবে তো? আমার জন্য একটা নতুন পোশাকও কিনে দেবে?

স্বর্ণার বাবা মহিন্দী পেশায় কাঠমিস্ত্রি। সারাদিন মানুষের বাড়িতে কাঠের কাজ করে যা রোজগার করেন, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। অভাবের সংসারে শখ পূরণ করার সুযোগ খুব একটা হয় না। তবু মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে তার সব কষ্ট যেন দূর হয়ে যায়।

একদিন স্বর্ণা বাবার কাছে এসে বলল,
—বাবা, জানো, এবার আমি মেলা থেকে একটা বড় পুতুল কিনব। পুতুলটাকে রাতে বুকে জড়িয়ে ঘুমাব।
মহিন্দী মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—আচ্ছা মা, চেষ্টা করব। আল্লাহ চাইলে এবার তোকে মেলায় নিয়ে যাব। বাবার কথা শুনে স্বর্ণার আনন্দ আর ধরে না। সে দৌড়ে মায়ের কাছে গেল।

—মা, মা! বাবা আমাকে মেলায় নিয়ে যাবে। আমি একটা বড় পুতুল কিনব!

মা মেয়ের উচ্ছ্বাস দেখে হাসলেন। স্বর্ণা তখন থেকেই মনে মনে মেলায় ঘোরার স্বপ্ন দেখতে লাগল। বাবার হাত ধরে মেলায় যাবে, মায়ের পাশে পাশে হাঁটবে, হাতে পরবে রঙিন চুড়ি। আর কিনবে মনের মতো একটি পুতুল। পুতুলটিকে সে নিজের ছোট্ট বোনের মতো আদর করবে।

এবার রাজবাড়ী জেলায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বেশ বড় আয়োজন হয়েছে। পূজামণ্ডপের পাশে বসেছে বিশাল মেলা। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছে সেখানে। সারি সারি দোকানে সাজানো খেলনা, পুতুল, মিষ্টি, চুড়ি, ফিতা আর রঙিন পোশাক। কোথাও নাগরদোলা ঘুরছে, কোথাও আবার বাজছে আনন্দের গান।

স্বর্ণার বান্ধবীরাও মেলায় যাবে। তারা সবাই মিলে ঘুরবে, গল্প করবে, মজার খাবার খাবে। এসব ভেবে স্বর্ণার দিন যেন আর কাটতেই চায় না। অবশেষে এলো সেই প্রতীক্ষিত দিন। সকাল থেকেই স্বর্ণার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। মা যত্ন করে তার চুল বেঁধে দিলেন। বিকালে বাবা বাড়ি ফিরলেন মেয়ের জন্য একটি নতুন পোশাক নিয়ে। সংসারের নানা খরচ সামলে অনেক কষ্টে টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। সেই জমানো টাকা থেকেই মেয়ের জন্য পোশাকটি কিনেছেন।
নতুন পোশাক পরে স্বর্ণা যখন বাবার সামনে এসে দাঁড়াল, মহিন্দীর চোখেমুখে ফুটে উঠল আনন্দ।

—আমার মেয়েটাকে আজ যে কী সুন্দর লাগছে!

স্বর্ণা বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—বাবা, তুমি পৃথিবীর সেরা বাবা! মেয়েকে বুকে জড়িয়ে মহিন্দী মৃদু হাসলেন। তার বুকটা আনন্দে ভরে উঠল।

সন্ধ্যায় মহিন্দী স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে মেলার উদ্দেশে রওনা হলেন। মেলার কাছাকাছি পৌঁছাতেই স্বর্ণার চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। চারদিকে আলোর ঝলকানি, মানুষের ভিড় আর দোকানের সারি। 

কোথাও খেলনা বিক্রি হচ্ছে, কোথাও মিষ্টির ঘ্রাণ ভেসে আসছে। নাগরদোলায় চড়ে শিশুরা আনন্দে চিৎকার করছে।
স্বর্ণা কখনো এদিকে তাকায়, কখনো ওদিকে। বাবার হাত ধরে সে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে লাগল।
হঠাৎ একটি খেলনার দোকানে তার চোখ আটকে গেল। দোকানের সামনের তাকে বসানো রয়েছে বড় একটি পুতুল। পুতুলটির পরনে সুন্দর পোশাক, মুখে মিষ্টি হাসি। ঠিক এমন একটি পুতুলই তো স্বর্ণা চেয়েছিল!

সে বাবার হাত ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
—বাবা, বাবা! ওই পুতুলটা আমার চাই। ওই যে বড় পুতুলটা! মহিন্দী পুতুলটির দাম জিগ্যেস করলেন। দাম শুনে তিনি একটু চুপ করে গেলেন। সংসারের খরচ আছে, সামনে আরও কত প্রয়োজন। এত টাকা খরচ করা তার জন্য সহজ নয়।
স্বর্ণা বাবার মুখের দিকে তাকাল। বাবার মনের কথা সে বুঝতে পারল না। শুধু পুতুলটির দিকে তাকিয়ে রইল।

মহিন্দী মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। তার উজ্জ্বল চোখে কত আশা! মেয়েটি কত দিন ধরে এই পুতুলটির স্বপ্ন দেখেছে। তিনি আর মেয়েকে নিরাশ করতে পারলেন না।

—আচ্ছা মা, তোর পুতুল তুই পাবি। পুতুলটি কিনে তিনি স্বর্ণার হাতে তুলে দিলেন। স্বর্ণা আনন্দে পুতুলটিকে বুকে জড়িয়ে ধরল।

—বাবা, তুমি সত্যিই সেরা! আমার স্বপ্নটা আজ সত্যি হলো!

মহিন্দী মেয়ের হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিজের কত শখ যে তিনি পূরণ করতে পারেননি! কিন্তু মেয়ের মুখে এই হাসি দেখে তার মনে হলো, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু হতে পারে না।

এরপর স্বর্ণা বান্ধবীদের সঙ্গে মেলায় ঘুরল। হাতে পরল রঙিন চুড়ি, খেল মজার খাবার। পূজামণ্ডপের চারপাশে আলোর সাজ দেখে মুগ্ধ হলো। আনন্দে কখন যে সময় পেরিয়ে গেল, সে টেরই পেল না।

রাত বাড়তে লাগল। এবার বাড়ি ফেরার পালা। স্বর্ণার এক হাতে নতুন পুতুল, অন্য হাতে মায়ের হাত। আরেক পাশে হাঁটছেন বাবা। বাড়ির পথে যেতে যেতে স্বর্ণা পুতুলটির মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল।

—মা, জানো, আজ থেকে ও আমার ছোট্ট বোন। আমি ওকে খুব আদর করব!

মা হেসে বললেন,
—তাই নাকি? তা হলে ওর যত্নও কিন্তু তোকে নিতে হবে!

স্বর্ণা মাথা নেড়ে বলল,
—নেব মা, খুব যত্ন করব।
সেদিন রাতে পুতুলটিকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল স্বর্ণা। তার মুখে লেগে রইল তৃপ্তির হাসি।

আর মেয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মহিন্দী ভাবলেন, মানুষের সুখ সবসময় বড় বাড়ি, দামি গাড়ি কিংবা অনেক টাকা-পয়সার মধ্যে থাকে না। কখনো কখনো প্রিয়জনের মুখে একটুখানি হাসি ফোটাতেই জীবনের সব আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়।

স্বর্ণার কাছে সেদিনের মেলা তাই শুধু আনন্দের একটি দিন ছিল না; ছিল বাবার ভালোবাসায় মোড়ানো এক মধুর স্মৃতি।

সময়েল আলো/প্রিন্ট/জেডআই
  বিষয়:   সাহিত্য 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: