প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১১ পিএম আপডেট: ২২.১০.২০২৬ ১০:২০ পিএম
কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি। ছবি : সংগৃহীত বাংলা সাহিত্যের সুপরিচিত কবি, অনুবাদক ও সাংবাদিক রথো রাফি মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৫১ বছর।
গত সোমবার থেকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন রথো রাফি। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তার ভাই এহতেশাম মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন।
বাংলা কবিতার জগতে নিরাভরণ কাব্যভাষার কারিগর হিসেবে পরিচিত ছিলেন রথো রাফি। কবিতা ও অনুবাদে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব ভাষাশৈলী। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য হারাল একটি স্বতন্ত্র কাব্যকণ্ঠ। রেখে গেছেন একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘অক্ষর ও বালির পৃথিবী’, বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কবির কবিতার অনুবাদ এবং একান্ত অনুরাগী পাঠকসমাজ।
১৯৭৫ সালের ৩১ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন রথো রাফি। পেশায় সাংবাদিক হলেও তার মূল পরিচিতি ছিল কবি হিসেবে। রসায়নশাস্ত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিলেও তার মনন গড়ে উঠেছিল কবিতা ও অনুবাদের জগতে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন ছোটকাগজ আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ছোটকাগজ ‘গাণ্ডীব’-এর নিয়মিত লেখক ছিলেন তিনি। সাময়িকীটির ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু সময়েও তার এই সম্পৃক্ততা বজায় ছিল।
বই প্রকাশের প্রতি অনীহা ছিল রথো রাফির কবিচরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘদিন কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ না করেও সমকালীন কবিতার জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন তিনি। অবশেষে ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম ও একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘অক্ষর ও বালির পৃথিবী’। ৪৩২ পৃষ্ঠার বইটিতে স্থান পেয়েছে দুই শতাধিক কবিতা। ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকে লেখা কবিতাগুলো নিয়ে সংকলনটি প্রকাশিত হয়।
তার কবিতায় মানুষের জন্ম-মৃত্যুর দর্শন থেকে শুরু করে কৃষ্ণের বাঁশি ও যিশুর ক্রুশযাত্রার মতো নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে স্বতন্ত্র কাব্যভাষায়।
কবিতার পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন রথো রাফি। এরিখ ফ্রাইড, চার্লস বুকোস্কি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত ও ইয়ারোস্লাভ সাইফার্টের মতো বিশ্বখ্যাত কবিদের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন তিনি। মূল লেখার আবেগ, ভাবনা ও দর্শন বাংলা ভাষায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার অনুবাদে ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তার কাজের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার পাঠকেরা বিশ্বকবিতার বিভিন্ন ধারা ও কণ্ঠের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
রথো রাফি বিশ্বাস করতেন, কবিতার আবেগতাড়িত সাড়ার চেয়ে বৌদ্ধিক অর্জন বেশি জরুরি। নিজস্ব চিন্তা ও কাব্যশৈলীর কারণে সমকালীন কবিদের ভিড়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে বাংলা কবিতা ও অনুবাদসাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠের অবসান ঘটল।
সময়ের আলো/এনএন