গ্রাফিক : সময়ের আলো শাঁখা, বালা, পলা ও নোয়া এখন অনেকেরই পছন্দের অনুষঙ্গ। হিন্দু নারীদের ঐতিহ্যবাহী এই অলংকার এখন সব ধর্মের নারীদের সাজেও জায়গা করে নিচ্ছে। এতে ফ্যাশনে মিশ্র সংস্কৃতির ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে।
একসময় শাঁখা, পলা, নোয়া ও বালার কথা উঠলেই মনে পড়ত হিন্দু নারীদের কথা। বিশেষ করে দুর্গাপূজা, বিয়ে কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসব অলংকারের ব্যবহার চোখে পড়ত বেশি। তবে সময় বদলেছে। এখন শুধু পূজা বা বিশেষ উৎসব নয়, দৈনন্দিন সাজেও এসব অলংকারের প্রতি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
মুসলিম নারীদের অনেকেও নিজেদের পছন্দ, পোশাক ও সাজের সঙ্গে মিলিয়ে শাঁখা, পলা, বালা কিংবা নোয়া পরছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই সাজের নানা ধরন দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের গতি ছাড়িয়ে অলংকারগুলো হয়ে উঠছে ফ্যাশনের নতুন অনুষঙ্গ।
ঐতিহ্য যখন ফ্যাশনের অংশ শাঁখা-পলার সঙ্গে হিন্দু নারীদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বিবাহিত নারীদের জীবনে এসব অলংকারের আলাদা তাৎপর্য আছে। অন্যদিকে নোয়া ও বালারও রয়েছে নিজস্ব নকশা ও ব্যবহাররীতি। প্রজন্মের পর প্রজনন্ম ধরে চলে আসা এই অলংকারগুলো এখন নতুনভাবে আবিষ্কৃত হচ্ছে ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছে। বর্তমান সময়ে পোশাক ও অলংকার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে। কে কোন ধর্মের, তার চেয়ে কোন সাজটি নিজের সঙ্গে মানানসই, সেটিই হয়ে উঠছে বড় বিষয়। তাই মুসলিম নারীদের হাতেও দেখা যাচ্ছে শাঁখা-পলা কিংবা নোয়ার মতো অলংকার। কেউ পরছেন শাড়ির সঙ্গে, কেউ আবার কুর্তি, সালোয়ার-কামিজ কিংবা লং ড্রেসের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন।
সাজে যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা
শাঁখা-পলা পরতে যেসব সময়ে ভারী সাজের প্রয়োজন, তা নয়। সাদা শাঁখা ও লাল পলার সঙ্গে সাধারণ শাড়িও পেতে পারে আলাদা মাত্রা। আবার সোনালি বা রুপালি নকশার বালা কিংবা নোয়া হাতের সাজে আনতে পারে
ভিন্নতা। যারা একটু ঐতিহ্যবাহী সাজ পছন্দ করেন, তারা একাধিক চুড়ির সঙ্গে এসব অলংকার মিলিয়ে নিতে পারেন। অন্যদিকে মিনিমাল সাজের জন্য বেছে নেওয়া যায় সরু নকশার বালা বা হালকা অলংকার। পোশাকের রঙের সঙ্গেও রাখা যায় সামঞ্জস্য। সাদা, লাল, কালো কিংবা অফ-হোয়াইট পোশাকের সঙ্গে শাখা-পলার বৈপরীত্য সুন্দর দেখাতে পারে।
তবে সব অলংকার একসঙ্গে পরতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ও রুচি অনুযায়ী একটি বা দুটি অনুষঙ্গ বেছে নিলেও সাজে আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি করা সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
ফ্যাশনের নতুন ধারা ছড়িয়ে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী অলংকারের সাজ দেখা যায়। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই নিজেদের মতো করে সাজ তৈরি করছেন। অনলাইনভিত্তিক গহনার দোকানেও নানা নকশা ও উপকরণের অলংকার পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী গহনা এখন নতুন প্রজন্মের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তবে এই প্রবণতাকে সবার পছন্দ বা সর্বজনীন ফ্যাশন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেউ সাংস্কৃতিক আগ্রহ থেকে এসব অলংকার পরছেন, কেউ নকশার সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হচ্ছেন, আবার কেউ নিজের পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন। প্রত্যেকের পছন্দের পেছনে রয়েছে আলাদা কারণ।
সম্মান থাকুক ঐতিহ্যের প্রতি
ফ্যাশন মানুষের নিজস্ব প্রকাশের একটি মাধ্যম। এক সংস্কৃতির অলংকার অন্য সংস্কৃতির মানুষের সাজে জায়গা করে নিলে তা পারস্পরিক আগ্রহ ও সৌন্দর্যবোধের প্রকাশ হতে পারে। তবে কোনো অলংকারের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক তাৎপর্য থাকলে সেটির প্রতিও সম্মান রাখা জরুরি। বিশেষ করে শাঁখা-পলা অনেকের কাছে নিছক সাজের উপকরণ নয়, বরং বিশ্বাস ও পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ।
শেষের কথা
শাঁখা, পলা, বালা ও নোয়ার জনপ্রিয়তা নতুনভাবে সামনে এনেছে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনকে। ফ্যাশনের ভাষা সময়ের সঙ্গে বদলায়। সেই পরিবর্তনে পুরোনো অলংকারও পায় নতুন পরিচয়। তবে ট্রেন্ড অনুসরণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিশ্বাস, স্বাচ্ছন্দ্য ও অন্যের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখাই হতে পারে সুন্দর সাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই