২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কার্সন। বৃহস্পতিবার রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি চলতি বছরের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করে। সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবার্গ স্টকহোম থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্মানজনক পুরস্কারের ঘোষণা দেন। ধ্রুপদি সাহিত্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যে নতুন ধারা তৈরি করেছেন অ্যান কার্সন। তার সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
অ্যান কার্সন তার পুরো কর্মজীবনেই কবিতা লেখা, অনুবাদ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ একসঙ্গে করেছেন। তার সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শব্দের উৎপত্তি ও ইতিহাস নিয়ে গভীর অনুসন্ধান আর নতুন অর্থ খোঁজার চেষ্টা। শব্দের ব্যুৎপত্তিকেই তিনি নিজের সব কাজের শুরুর জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
একাডেমির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাচীন ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে অত্যন্ত চমৎকার ও কৌতুকপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে সমসাময়িক সাহিত্যের নতুন রূপ তৈরি করার পেছনে তার ‘সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের’
স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।
প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও ভাষা নিয়ে অ্যান কার্সনের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তার লেখায় প্রাচীন গ্রিক পুরাণ, দর্শন ও আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির মেলবন্ধন দেখা যায়। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ— বিভিন্ন সাহিত্যরীতির সীমানা পেরিয়ে তিনি নিজস্ব লেখার ধরন তৈরি করেছেন। ধ্রুপদি সাহিত্যের উপাদানকে নতুনভাবে ব্যবহার করে সমকালীন সাহিত্যে ভিন্নধর্মী প্রকাশভঙ্গি তৈরির জন্য তিনি পরিচিত।
শব্দের উৎপত্তি বা ব্যুৎপত্তি তার লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে তার করা অনুবাদগুলোও স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশ নিয়ে কার্সনের উল্লেখযোগ্য কাজ ‘ইফ নট, উইন্টার’ প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। এ ছাড়া সোফোক্লিসের ‘এলেক্ট্রা’ ও ‘অ্যানটিগোন’ এবং ইউরিপিদিসের ‘বাক্ষাই’ অনুবাদ করেছেন তিনি।
তবে কার্সনের কাজ শুধু অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাচীন সাহিত্যকে আধুনিক অভিজ্ঞতা ও ভাষার সঙ্গে মিশিয়ে তিনি তৈরি করেছেন নতুন ধরনের সাহিত্যিক রূপ। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘এরোস দ্য বিটারসুইট’ বইটি কার্সনের সাহিত্যভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বইটিতে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও দূরত্বের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।
স্যাফোর একটি শব্দবন্ধকে কেন্দ্র করে কার্সন দেখিয়েছেন, প্রেমের মধ্যে একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনা থাকতে পারে। পরবর্তী সাহিত্যকর্মেও বিভিন্ন সময় ও সাহিত্যের ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠকে পাশাপাশি নিয়ে আসার প্রবণতা দেখা যায়। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড : অ্যা নভেল ইন ভার্স’ কার্সনের অন্যতম পরিচিত কাজ। প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের একটি পৌরাণিক চরিত্র জেরিয়নকে কেন্দ্র করে বইটি লেখা।
গ্রিক পুরাণের ভয়ংকর লাল ডানাওয়ালা দৈত্যকে কার্সন আধুনিক এক তরুণ চরিত্রে রূপ দিয়েছেন। ফলে প্রাচীন পুরাণের সঙ্গে আধুনিক প্রেম, পরিচয় ও মানবিক সম্পর্কের গল্প একসঙ্গে মিশে গেছে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গ্লাস এসে’-এ দুঃখ, বিচ্ছেদ ও একাকিত্বের গল্প উঠে এসেছে। এখানে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধের সীমারেখা অনেকটাই মুছে দিয়েছেন কার্সন।
২০১০ সালে প্রকাশিত ‘নক্স’ বইটিও তার ব্যতিক্রমী কাজগুলোর একটি। মৃত ভাই মাইকেলের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে বইটি তৈরি। ছবি, চিঠি ও বিভিন্ন লেখা একটি বাক্সের মধ্যে সাজিয়ে তিনি বইটিকে এক ধরনের শিল্পকর্মের রূপ দিয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন রোমান কবি ক্যাটুলাসের ভাইকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা।
কার্সনের কাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সাহিত্যের প্রচলিত সীমারেখায় আটকে থাকেননি। ২০১৬ সালের ‘ফ্ল্যাট’ বইটি ২২টি ছোট বইয়ের সমন্বয়ে তৈরি। এগুলো বিভিন্ন বিষয়ে লেখা এবং ইচ্ছামতো ক্রমে পড়া যায়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নরমা’ বইয়েও বিভিন্ন ধরনের লেখা একসঙ্গে জায়গা পেয়েছে।
চিত্রশিল্পী, কোরিওগ্রাফার, অপেরা ও থিয়েটার নির্মাতাদের সঙ্গেও কাজ করেছেন কার্সন। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডার্স ওলসন কার্সনের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করেছেন। তার মতে, কার্সনের লেখার মাধ্যমে কবিতা, প্রাচীন সাহিত্য, আধুনিক সাহিত্য ও বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের মধ্যে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই স্বাধীন ও পরীক্ষামূলক লেখার ধরনই সমকালীন আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে কার্সনের কাজকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোতে জন্ম নেওয়া কার্সন ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং ধ্রুপদী সাহিত্যের অধ্যাপক। দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের অধ্যাপনা করা কার্সনের সাহিত্যকর্মে প্রাচীন গ্রিক পুরাণ ও ধ্রুপদি ইতিহাসের গভীর প্রভাব দেখা যায়। তার কাজ কবিতা, প্রবন্ধ ও কল্পকাহিনির সীমানা ভেঙে এক নতুন ঘরানার সৃষ্টি করে, যা সাহিত্য সমালোচকদের কাছে অত্যন্ত প্রশংসিত। ১৯৮১ সালে তিনি ক্লাসিকস বিষয়ে ডক্টরেটের গবেষণাপত্র ‘ওডি এট অ্যামো এগ্রো সাম’ প্রকাশ করেন।
পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তে ৭৬ বছর বয়সি এই কবি আইসল্যান্ডে বাতাস শুনছিলেন এবং এই খবরের জন্য তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। এই অসামান্য অর্জনের জন্য পুরস্কার হিসেবে তিনি একটি স্বর্ণপদক, একটি ডিপ্লোমা এবং ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার) আর্থিক অনুদান পাবেন। আগামী ১০ ডিসেম্বর বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের রাজা ষোড়শ কার্ল গুস্তাফের হাত থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার গ্রহণ করবেন।
সাহিত্যে অবদানের জন্য অ্যান কার্সন ম্যাকআর্থার এর আগে ফেলোশিপ ও টি. এস. এলিয়ট প্রাইজসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যে তার স্বতন্ত্র ও উদ্ভাবনী কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলল।
সুইডিশ একাডেমি জানিয়েছে যে, কার্সনের প্রায় সব সাহিত্যকর্মই আবর্তিত হয়েছে শব্দের প্রতি একজন ভাষাতাত্ত্বিকের তীব্র আকর্ষণ এবং নতুন অর্থের প্রতি একজন কবির আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে। ২০১৮ সালের যৌন কেলেঙ্কারির বিতর্কের পর সুইডিশ একাডেমি তাদের ভাবমূর্তি ফেরাতে এবং বিজয়ীদের বৈচিত্র্য বাড়াতে প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে নারী ও পুরুষ সাহিত্যিকদের নোবেল দেওয়ার যে ধারা বজায় রাখছে, তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর হাঙ্গেরীয় লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের পর এ বছর এই পুরস্কার পেলেন একজন নারী কবি। নোবেল পুরস্কারের ১২৫ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে অ্যান কার্সন সাহিত্যে নোবেলজয়ী ২০তম নারী।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই