কাফকার শব্দকুঠার

মোহিত কামাল

সাহিত্য

টেবিলের ওপর ঘাড় গুঁজে লিখছিলাম।কলমের নিব কাগজের শরীর ছুঁয়ে শব্দ বানাচ্ছিল। কিন্তু শব্দগুলো যেন প্রাণ পাচ্ছিল না, কেবল অসাড় হয়ে

2026-10-23T19:30:47+00:00
2026-10-23T19:31:01+00:00
 
  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬,
৭ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
সাহিত্য
কাফকার শব্দকুঠার
মোহিত কামাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩০ পিএম  আপডেট: ২৩.১০.২০২৬ ৭:৩১ পিএম
গ্রাফিক সময়ের আলো
টেবিলের ওপর ঘাড় গুঁজে লিখছিলাম।

কলমের নিব কাগজের শরীর ছুঁয়ে শব্দ বানাচ্ছিল। কিন্তু শব্দগুলো যেন প্রাণ পাচ্ছিল না, কেবল অসাড় হয়ে পড়ে থাকছিল।

জানালার পাল্লা আধখোলা। বাইরে কোনো বাতাস নেই, তবু পর্দা কাঁপছিল। ঘরজুড়ে ছিল এক ধরনের ঘন নিস্তব্ধতা। তবে ঘড়ির টিকটিক, দূরের গাড়ির হর্ন, পাতা ওল্টানোর শব্দ ছিল। কিন্তু গভীরতা ছিল না। তখনও আমি বুঝিনি, শব্দ আর গভীরতা এক জিনিস নয়।

হঠাৎ শুনলাম দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হচ্ছে।

জোরে নয়, তাড়াহুড়োরও নয়, ঠিক এমন এক ছন্দে, যা লেখার ভেতর ঢুকে পড়ে ছন্দ ভেঙে দেয়। মনে হলো, এই শব্দটা আমার ভেতরেই কোথাও ছিল, শুধু বাইরে থেকে অনুমতি নিয়ে ঢুকল।

আমি কি দরজা লক করে রেখেছি? মনে জেগে ওঠা প্রশ্নটার কারণে মাথা ঘুরিয়ে দেখি হুক লাগানো।

হুকের ওপর আলো পড়ে একটা ক্ষুদ্র ছায়া তৈরি করেছে, যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে, আবার নেইও।

না-উঠেই জিগ্যেস করলাম, ‘কে?’

‘আমি কাফকা।’

কলমটা থেমে গেল।

‘কোন কাফকা?’

‘চেক লেখক-ফ্রানৎস কাফকা।’

নিজেই হাসলাম।

‘অসম্ভব। কাফকা ১৮৮৩ সালে জন্মেছেন, ১৯২৪ সালে মারা গেছেন।’

একটু থেমে সে বলল, ‘কে বলল আমি মারা গেছি?’

ঘরের আলো হঠাৎ যেন একটু ফিকে হয়ে এলো। বাতির নিচে টেবিলের ছায়া লম্বা হলো, আবার সংকুচিত।

‘দরজা খোলো।’ কণ্ঠ বলল।

‘তুমি কীভাবে ওপারের পৃথিবী থেকে এলে? ভূত নাকি?’

‘ভূত নই।’ শান্ত, প্রায় নির্লিপ্ত কণ্ঠ।

‘আমি শব্দস্রোতে ভেসে থাকি। কখনো উজানে ফিরে আসি তোমাদের দ্বারে, কখনো ভাটিতে চলে যাই গভীর সাগরের দিকে। সেখানে পাঠক নেই, শুধু নীরবতা।’

‘তুমি কবিতার স্বরে কথা বলছ।’ আমি বললাম।

‘কারণ গদ্যও এক ধরনের কবিতাই। শুধু ছন্দটা লুকানো থাকে।’ সে উত্তর দিল।

উত্তর শুনে ভালো লাগল। তবু চুপ করে আছি।

‘মাথা তুলে সামনে তাকাও।’

আমি তাকালাম।

সে ছিল। আবার ছিল না। তবে দেখলাম আমার টেবিলের ওপর রাখা কাফকার ফ্ল্যাশফিকশন এবং অণুগল্পের অনুবাদ বইগুলো অদ্ভুতভাবে ধুলোবালিমুক্ত হয়ে সাজানো। যেন কেউ দীর্ঘ সময় ধরে পরম মমতায় ওদের ছুঁয়ে গেছে।

এখানে কোনো মানবমূর্তি নেই। বাতাসও স্থির।

‘দেখছ আমাকে।’ কণ্ঠ বলল।

‘হ্যাঁ।’ আমি ফিসফিস করলাম।

‘কিন্তু তুমি কোথায়?’

‘আমার শব্দ আর অনুবাদে। তোমার একেবারে চোখের সামনে আছি।’

আমি উঠে দরজা খুললাম।

বাইরে কেউ নেই। করিডোরে বাতির আলো নিঃসঙ্গ।

মনে হলো, দেয়ালগুলোও কান পেতে আছে।

‘কই তুমি?’

‘আমি তো তোমার টেবিলেই।’

‘সেখানে তো বই ছাড়া কিছু নেই। তোমার কোনো ছবিও না।’

‘আছে।’ সে বলল।

‘মলাট ওল্টাও। ছবি পাবে। কিন্তু ওই ছবির ভেতরে আমার কোনো প্রাণ নেই।’

আমি বইয়ের মলাট ওল্টালাম। কাফকার চেনা মুখ, গভীর চোখ, কঠিন নীরবতা। ছবিটা যেন তাকিয়ে আছে, কিন্তু দেখছে না।

‘তা হলে প্রাণ কোথায়? তুমি কীভাবে কথা বলছ?

একবার দরজার বাইরে, আবার টেবিলের ভেতর থেকে?’

‘ওটাই আমার বৈশিষ্ট্য।’ কাফকা বলল।

‘আমার প্রাণ লুকিয়ে আছে আমার সৃষ্ট শব্দের ভেতর। ওরা “আমি-হয়ে” কথা বলে। লেখক মরে, কিন্তু শব্দ মরে না, আত্মহত্যা করে না।’

আমি তাকিয়ে রইলাম বুকশেলফে রাখা কাফকার অনূদিত অণুগল্পের গ্রন্থটির দিকে।

মনে হলো, বইয়ের পাতাগুলো খুব ধীরে নিশ্বাস নিচ্ছে। প্রতিটি গল্প যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে ব্যস্ত।

‘এখন কেন জেগে উঠলে? আমার টেবিলেই বা কেন?’

‘কারণ তোমার লেখার মগ্নতায় ফাঁক আছে।’ সে বলল।

‘দরজার শব্দ তোমার মনোযোগ ভেঙেছে। মানে তুমি গভীরে ডুবে যাওনি। জীবনের উপরিভাগে ভেসে থাকলে ভেতরের তলে নামা যায় না। লেখালেখি আর পানিতে নামা কি এক জিনিস? পা ভিজিয়ে সমুদ্র বোঝা যায়?’

আমি নীরব রইলাম।

মনে পড়ল, কতবার কত শব্দ লিখেছি। শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়াও করেছি, কিন্তু ভেতরে ঢুকিনি।

‘এই কথাটাই বলতে এসেছি।’ সে বলল।

‘কলমকে কুঠারে পরিণত করো। তোমার শব্দকুঠার মানুষের মগজে আঘাত করুক।’

‘নরম মগজ থেঁতলে যাবে। আমি নিষ্ঠুর নই।’

‘এটা নিষ্ঠুরতা নয়।’ কাফকা বলল।

একটু থেমে আবার বলল, ‘এটা প্রয়োজন। তোমার শব্দকুঠার থেকে ধারালো বই জন্ম নেবে। মানুষ যখন তা পড়বে, তাদের ভেতরে জমে থাকা নিষ্ঠুরতা আর হিংস্রতার জমাট বরফ ফাটতে শুরু করবে।’

‘তোমার শব্দকুঠার কি পেরেছে মানুষের হিংস্রতা কমাতে?’

দীর্ঘ নীরবতা। এবার নীরবতাটা বেশ ভারী। ‘চুপ কেন? বিশ্বজুড়ে এত হিংস্রতা কেন এখনও?’

‘আমি দুঃখিত।’ সে জবাব দিল।

আরও বলল, ‘আমার শব্দ পৃথিবীর হিংস্রতা কমাতে পারেনি। কিন্তু অনেক লেখককে জাগিয়েছে। তাদের কেউ কেউ নোবেল পেয়েছেন। কেউ কেউ নিঃশব্দে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছেন। আর কেউ কেউ শুধু একজন মানুষকে বদলাতে পেরেছেন, সেটাও কম নয়।’

‘সবার ব্যাপারে কি তুমি আশাবাদী?’

‘হ্যাঁ।’ সে বলল।

‘কারণ যারা এখনও লিখছে, তারা এখনও হাল ছাড়েনি। শব্দ যতদিন লেখা হচ্ছে, ততদিন মানুষ পুরোপুরি হারেনি।’

কণ্ঠ মিলিয়ে গেল। রয়ে গেল শব্দ। ঘরের নিঃশব্দতা এবার আর ফাঁপা লাগল না। ওটা পূর্ণ।

আমার কলম এখন আর আগের মতো নেই। মনে হচ্ছে এটা একটা কুঠার।

‘হ্যাঁ ঠিক মনে করেছ। এখন কুঠার চালাতে হবে, ধারালো শব্দ নির্মাণ করতে হবে। নতুন শব্দ দিয়ে পৃথিবীর মানুষের হিংস্রতা দূর করতে হবে।’ দীপ্তকণ্ঠে বলল কাফকা।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   সাহিত্য  মানুষ  উত্তর  শূন্যতা  ঋতু  রিক্ততা  সময়ের আলো  কবিতা 


Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: