বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসতেন অন্নদাশঙ্কর রায়। গ্রাফিক : সময়ের আলো ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙ্গে ভাগ করো
তার বেলা?’
খুকি ও খোকা কবিতায় এভাবেই নিজের মনের দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বাংলা ভাষার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়। এ কবিতার মতোই অনেক লেখায় ওপার বাংলার পাশাপাশি এপার বাংলার কথাও বলে গেছেন তিনি। তিনি পূর্ববাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন তার লেখনীর মাধ্যমে। দেশভাগের বাস্তবতা মেনে নিতে না পারা, বাংলা ও বাংলা ভাষাকে তুমুল ভালোবাসা এই লেখকের আজ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০২ সালে আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় তার জীবনাবসান ঘটে। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০৪ সালের ১৫ মার্চ, ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীন ঢেঙ্কানলে (বর্তমানে উড়িষ্যা)।
অন্নদাশঙ্কর রায় তার ‘যুক্তবঙ্গের স্মৃতি ও মুক্তবঙ্গের স্মৃতি’তে লিখেছেন, বিএ পাশ করার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই আইসিএস পরীক্ষায় বসব ও সফল হলে বিলেত যাব। তার বছরখানেক বাদে সিদ্ধান্ত নিই যে, সাহিত্য সৃষ্টির কাজ শুধু বাংলাতে করব। ইংরেজিতেও না, ওড়িয়াতেও না। তার পরের বছর সিদ্ধান্ত নেই যে, আমি কোন প্রদেশে নিযুক্ত হতে চাই জিজ্ঞাসা করলে আমি উত্তর দেব তখনকার দিনের বাংলাদেশ। ভারতের অন্য কোনো প্রদেশে নয়।
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্নদাশঙ্কর রায়কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি বাংলাদেশ বেছে নিলে কেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বাংলা সাহিত্যের লেখক। তাই বাংলাদেশ আমার প্রকৃত স্থান।’
চাকরিসূত্রে বাংলাদেশের নওগাঁয় অবস্থানকালীন তিনি পূর্ব বাংলার মাটি, মানুষ, নদী ও প্রকৃতির প্রেমে পড়েন। তার এই প্রেম আরও প্রগাঢ় হয় কুষ্টিয়ায় মহকুমা হাকিমের দায়িত্ব পালনের সময়।
‘জীবন যৌবন’ গ্রন্থে তিনি লেখেন- আমরা কুষ্টিয়ায় যত সুখী ছিলুম, আর কোথাও অত সুখী ছিলুম না। আমি তো ভেবেছিলুম, অকালে অবসর নিয়ে কুষ্টিয়াতেই বসবাস করব। সেই মহকুমাতেই রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ আর লালন ফকিরের ছেঁউড়িয়া। আমার মতে রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়াই হচ্ছে সারা বাংলার হৃদয় ভূমি।
তিনি আরও লিখেছেন, আইসিএস অফিসার নিযুক্তির পর এক এক করে অনেকগুলি জেলায় কাজ শিখি ও কাজ করি। মুর্শিদাবাদ, হুগলি, বাঁকুড়া, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা, আবার বাঁকুড়া। তারপর নদীয়া, আবার রাজশাহী, আবার চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা, মেদিনীপুর, আবার বাঁকুড়া, আবার নদীয়া, বীরভূম, ময়মনসিংহ, হাওড়া। এখানে অবিভক্ত বাংলায় ছেদ। অতঃপর কলকাতা, আবার মুর্শিদাবাদ, আবার কলকাতা। এখানে চাকরিতে শেষ।
‘জীবন যৌবন’ গ্রন্থের শেষভাগে এই বিচ্ছেদের যন্ত্রণা নিয়ে তিনি লেখেন- ছিন্ন হয়ে গেল পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আমার এতদিনের প্রশাসনিক সম্পর্ক। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বলতে যাকে বোঝায়, তা পূর্ববঙ্গই। সোনার বাংলা যাকে বলা হয়, সেও পূর্ববঙ্গ। হায়, সেখানে আমি বিদেশী।
‘যুক্তবঙ্গের স্মৃতি ও মুক্তবঙ্গের স্মৃতি’তে তিনি লিখেছিলেন, পূর্ববঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কটা কোনোদিনই জন্মসূত্রে ছিল না। পুরুষাক্রমিকও নয়। সম্পর্কটা কর্মসূত্রে। ভালোবাসার রেশমী সুতো, সেটিও তার একটি সূত্র। সেই সূত্রে আমি এখনো তার সঙ্গে বাঁধা।
দেশ-ভূগোলের নামে মানুষের বিভক্তি অন্নদাশঙ্কর রায়কে ব্যথিত করত। তিনি পথে প্রবাসে গ্রন্থে লিখেছেন- যেদিন আমি বিদেশ যাত্রা করেছিলুম, সেদিন শুধু দেশ দেখতে যাইনি। গেছলুম মানুষকেও দেখতে, মানুষের সঙ্গে মিশতে, মানুষের সঙ্গে নানা সম্বন্ধ পাতাতে। দেশের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সৌন্দর্যের চেয়ে দেশের মানুষ সুন্দর। মানুষের অন্তর সুন্দর, বাহির সুন্দর, ভাষা সুন্দর, ভূষা সুন্দর। দেশ দেখতে ভালো লাগে না, যদি দেশের মানুষকে ভালো না লাগে। যে দেশে যাও, সেদেশে দেখবে মানুষের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই, মানুষের সৌন্দর্যের ছোঁয়া লেগে বুঝি বাকি সব সুন্দর হয়েছে।
অন্নদাশঙ্কর রায় যেখানে হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস সবই লিখেছেন তিনি। তার সৃষ্টিসম্ভার বৈচিত্র্যময় ও বিপুল। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এ দুধারা থেকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ ও সমন্বয় করেছেন। আধুনিকতা ও ঐতিহ্যকে একসুঁতোয় বাঁধতে সক্ষম হয়েছিলেন এই ঋদ্ধ লেখক। তাইতো আইসিএস কর্মকর্তা হিসেবে পেশাজীবন পার করলেও, সাহিত্যিক পরিচয় সেটিকে ছাপিয়ে গেছে।
সময়ের আলো/মহু